বাংলাদেশি জেলে খুন রাখাইনে

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩৩ এএম

অপহরণের ১৮ দিন পর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে কম্বল মোড়ানো অবস্থায় মোস্তাফিজ (৩৮) নামে বাংলাদেশি এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত রবিবার রাতে পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমানপাড়া সীমান্ত থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। গ্রামবাসীর ধারণা, নদী থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে যায় রাখাইনের বিদ্রোহীরা।

এদিকে একদিন শান্ত থাকার পর ফের কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে সীমান্তের লোকজন। 

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও নিহতের পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে অভ্যন্তরে সংঘাত চলাকালে সীমান্তে নাফ নদে মাছ ধরতে যান মোস্তাফিজ। সে সময় রাখাইনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নৌকা নিয়ে এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এর ১৮ দিন পর রবিবার রাতে সীমান্ত খালের পাশে কম্বল মোড়ানো অবস্থায় মোস্তাফিজের মরদেহ পাওয়া যায়।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন বলেন, গত ৮ ফেব্রুয়ারি সীমান্তবাসীকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে জেলা প্রশাসন একটি বৈঠক করে। বৈঠকে মোস্তাফিজকে অপহরণের বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। সে সময় সরকারিভাবে তাকে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।

উখিয়া থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, নিহত মোস্তাফিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। লাশ দেখে মনে হয়েছে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, নাফ নদের পূর্ব ও দক্ষিণাংশে রাখাইন রাজ্য। কয়েক দিন ধরে সেখান থেকে গুলির শব্দ আসছে। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, রাখাইন রাজ্যের মংডুর শহরের পাশের মেগিচং, কাদিরবিল, নুরুল্লাহপাড়া, মাংগালা, নলবন্ন্যা, ফাদংচা ও হাসুরাতা এলাকায় সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াই চলছে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারের ওই পারে রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের আশপাশে এলাকায় প্রচুর গোলাগুলি হয়েছে। পাশাপাশি বিকট শব্দে কেঁপে

উঠছিল টেকনাফ সীমান্ত। গত রবিবার কিছুটা শান্ত থাকলেও সোমবার সকাল থেকে বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে টেকনাফ সীমান্ত।’

বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, নাফ নদের সীমান্তে তাদের টহল জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। এ ঘটনা কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, একদিন শান্ত থাকার পর আবার সোমবার সকাল থেকে বিকট শব্দে টেকনাফ সীমান্ত কেঁপে উঠছে জানতে পেরেছি। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল বাড়ানোর হয়েছে। সীমান্তে বসবাসরত মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

রাখাইনের উত্তরাঞ্চল থেকে সরে আসছে জান্তা : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চল থেকে সরে আসছে দেশটির সামরিক জান্তার অনুগত বাহিনী। এ দাবি করে রাজ্যটির বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) দাবি করেছে, ওইসব এলাকায় বেসামরিক বসতি লক্ষ্য করে আকাশপথে হামলা আরও জোরদার করতে যাচ্ছে জান্তা। এর আগে তিনটি বিদ্রোহী সংগঠনের জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স দাবি করে, রাখাইনে হারতে চলেছে সামরিক বাহিনী।

সামরিক জান্তা গত রবিবার রাখাইনের মিয়েবোন টাউনশিপ থেকে আকাশপথে সেনাদের তুলে নিয়ে যায়। জান্তা এসব সেনাকে দক্ষিণে সরিয়ে নেয়। এরপরই আরাকান আর্মি ওই বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ‘নিজেদের রক্ষা করতে এলে জান্তা নিশ্চিত হারবে। তাই তারা সামরিক চৌকি এবং ঘাঁটিগুলোতে পুড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সেখান থেকে সরিয়ে নিচ্ছে, কারণ আমরা তা দখল করতে যাচ্ছি।’ সংগঠনটি বলছে, ঘাঁটি ত্যাগ করার সময় যাবতীয় গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করেছে জান্তার সেনারা।

এদিকে আরেকটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ সীমান্তের অদূরে রাখাইনের মংডু এলাকায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বৈঠক করেছে জান্তার অনুগতরা। বলা হচ্ছে, ওই সভায় মুসলিম নেতৃত্বকে জান্তার বাহিনী অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বলছে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পেরে না উঠতে পেরে এখন মুসলমানদের কাছে টানতে চাইছে জান্তা।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি জান্তা-সমর্থিত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তারা একটি সভা আহ্বান করে যেখানে উপস্থিত ছিলেন ওই এলাকার মুসলিম মৌলবিরা। এক মৌলবি জানান, জান্তার অনুগত কর্মকর্তারা তাদের বলেছে, তারা সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করলে তাদের গ্রামগুলো সুরক্ষিত থাকবে। মুসলিম নেতারা জান্তাকে প্রস্তাব দিয়েছে, তারা অস্ত্র হাতে নিতে পারে, যদি তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশ মুসলিম জান্তার প্রস্তাবে রাজি নয় বলে দাবি করেছে আরাকান আর্মি।

উল্লেখ্য, রাখাইনের মুসলমানরা ‘রোহিঙ্গা’ নামে পরিচিত। জান্তার আক্রমণের মুখে তাদের প্রায় ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত