ডলার সংকটে যখন দেশের পুরো অর্থনীতি ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, ঠিক সে সময়ে অর্থ পাচার ভয়াবহ আকারে বেড়েছে। আর এ পাচারের সিংহভাগই হচ্ছে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এর ৮০ শতাংশই হয়েছে ব্যাংকের মাধ্যমে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রকাশিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হচ্ছে তার সিংহভাগই বিদেশি বাণিজ্যের মাধ্যমে হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাচার হচ্ছে। মূলত আমদানিতে বেশি মূল্য ও রপ্তানিতে কম মূল্য দেখিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচার করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানির অনুমতিপত্র জালিয়াতি করে পণ্য পাঠানো হয়েছে। আর যে মূল্যের পণ্য পাঠানো হয়েছে, তার চেয়ে কম মূল্য দেখানো হয়েছে। গত বছর নমুনা হিসেবে বিপুল পরিমাণের পণ্য পাঠানোর নামেও অর্থ পাচারের বিষয়টি ধরা পড়েছে। শুল্ক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ পাচারের ঘটনা বেশি ঘটছে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে।
বাংলাদেশে সন্দেহজনক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএফআইইউ। সংস্থাটির প্রধান মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটে ১৪ হাজার ১০৬টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন বা এসটিআর জমা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৬৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে এমন লেনদেন ও কার্যক্রম হয়েছিল ৮ হাজার ৫৭১টি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮০টি।
বিএফআইইউর প্রধান মাসুদ বিশ্বাস বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) ৮০ শতাংশ হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংক যদি এটি বন্ধে সহযোগিতা না করে তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ একবার মানি লন্ডারিং হয়ে গেলে তা ফেরত আনা যায় না। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও সহযোগিতার জন্য ১০ দেশের সঙ্গে এমওইউ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ২০২০ সালের তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়, টাকার অঙ্কে তা প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। সাত বছরে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। অথচ সরকারকে বিদেশি মুদ্রার সংকট মোকাবিলা করতে আইএমএফ থেকে সাড়ে তিন বছরের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ করতে হয়েছে, যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যেমন বাংলাদেশকে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হতো না, তেমনি দেশে রিজার্ভ সংকটও তৈরি হতো না। বাণিজ্যের মাধ্যমে কারসাজি করে অর্থ পাচারের তালিকায় বিশ্বের ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘মানি লন্ডারিং একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম। এখানে বহু পক্ষ জড়িত থাকে, বহু দেশ জড়িত থাকে। আমাদের দেশের আইন আর অন্য দেশের আইন এক নয়। আমরা কিছু আছি সিভিল ল কান্ট্রির দেশ, কিছু আছে কমন ল কান্ট্রির দেশ। এটা নিয়েও ভাবার আছে।’
তিনি বলেন, ‘একটা উদাহরণ আমাদের কাছে আছে, সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়া ২০ লাখ ৪১ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার আমার ফেরত এনেছি। এটা কোকোর (আরাফাত রহমান) টাকা ছিল।’
বিএফআইইউ প্রধান বলেন, ‘একবার যদি মানি লন্ডারিং হয়ে চলে যায়, সেটা আর ফিরে আসে না। আমরা ২০১২ সালে এমএলএ-অ্যাক্ট করেছি। আমরা ১০টি দেশে এমএলএ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা নিয়ে কাজ করছে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বিশ্বাস বলেন, বিএফআইইউর তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে দুদক মামলা করেছে ৪৭টি, সিআইডি ১০টি এবং এনবিআরের বিশেষ সেল ২টি। এগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৮০৯টি সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট জমা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। তার আগের অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৯৯টি রিপোর্ট জমা দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রিপোর্ট জমা দেয় ১২১টি। আর এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ৯০০ রিপোর্ট জমা দিয়েছে।
বিএফআইইউর প্রধান বলেন, দেশের অর্থ পাচারের সিংহভাগই হচ্ছে বিদেশি বাণিজ্যের মাধ্যমে। তাই গত অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি (ঋণপত্র) মনিটরিং করে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নজরদারির মধ্যে অর্থ পাচার বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, হংকং-চীন। এই ১০ দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তির (এমএলএ) ঘোষণা দিয়েছে বিএফআইইউ। ইতিমধ্যে সরকারকে এ বিষয়ে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সরকার এটি গ্রহণ করার পর দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হবে।
