দ্বীনের আলো ছড়ানো ভাটি-বাংলার প্রবাদপুরুষ

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:০৫ এএম

আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের কিংবদন্তি হাদিস বিশারদ। প্রবাদতুল্য আরবি সাহিত্যিক ও বিদগ্ধ ফকিহ। সর্বমহলে সমাদৃত একজন বাগ্মী বক্তা। দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন অবিরত। ভাটি-বাংলার প্রবাদপুরুষ খান সাহেব হুজুরখ্যাত মাওলানা নুরুল ইসলাম খান সুনামগঞ্জী। তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অসংখ্য আলেমের স্নেহধন্য। বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয় এই ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার প্রসিদ্ধ গ্রাম দরগাহপুরের উজ্জ্বল প্রদীপ খতিবে জামান মাওলানা নুরুল ইসলাম খান। পিতার নাম সৈয়দ খান। দাদার নাম আকিল খান। মায়ের নাম সূর্যউজ্জল বানু। বরেণ্য এই আলেম ১০ জুন ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। সুনামগঞ্জ তথা সিলেট অঞ্চলের আলেম সমাজে ‘খান সাহেব হুজুর’ বলতে তাকেই বোঝায়। তার পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষ সবাই অত্যন্ত ধর্মভীরু ছিলেন। ছিলেন বুজুর্গদের সান্নিধ্যধন্য। পাঁচ ভাই আর এক বোনের মধ্যে মাওলানা নুরুল ইসলাম খান চতুর্থ।  খান সাহেব হুজুর জন্মের পর অসুস্থ ছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা ছিল। তখন তার দাদি আল্লাহর দরবারে নাতির সুস্থতার জন্য আকুল হয়ে প্রার্থনা করেন, আল্লাহর রহমতে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মাওলানা নুরুল ইসলাম খানের পড়ালেখার সূচনা হয় পাথারিয়া নিবাসী হাফেজ সিদ্দিক আলী (রহ.)-এর কাছে। অল্পদিনেই তিনি কায়দা ও আমপারা শিক্ষা করতে সক্ষম হন। শৈশবে তার উন্নত আচার-ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করত। দ্বীনের বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জনের পর চাচা তমিজ খান তাকে কোরআন মাজিদ হেফজ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। দরগাহপুর মাদ্রাসার তখন ছিল সূচনালগ্ন। খলিফায়ে মাদানি আল্লামা আব্দুল মতীন শায়খে ফুলবাড়ী (রহ.) তাকে কোরআন মাজিদের প্রথম সবক দেন। ১৯৫৮ ইংরেজির ৯ মার্চ দরগাহপুর মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ১৩৮০ হিজরিতে ৫ম শ্রেণির আযাদ দ্বীনি এদারা বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ঈর্ষণীয় ফলাফল করেন। তখন তিনি এত ছোট ছিলেন যে, তাকে কোলে করে লঞ্চে উঠিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হতো।

প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ছাফেলা প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে টানা চার বছরে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং ১৩৮৪ হিজরিতে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৩৮৫ হিজরিতে কাফিয়া জামাতে, ১৩৮৬ হিজরিতে শরহে জামি জামাতে পড়েন। ১৩৮৭ হিজরিতে তিনি মুখতাসার জামাতে ভর্তি হন। এ বছরও বোর্ড পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল করেন। পরের বছর ১৩৮৮ হিজরিতে দরগাহপুর মাদ্রাসা থেকে চলে যান রানাপিং মাদ্রাসায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই সেখান থেকে চলে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিখ্যাত মাদ্রাসা জামেয়া ইউনুছিয়ায়, ভর্তি হন জালালাইন জামাতে। তবে সেখানে পুরো বছর কাটাতে পারেননি, পুনরায় ভর্তি হন দারুল উলুম দরগাহপুরে এবং বছরের অবশিষ্ট দিনগুলো এখানে লেখাপড়া করতে থাকেন। এরপর ১৩৮৯ হিজরিতে মিশকাত জামাতে ভর্তি হন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তান চলে যান। ১৩৮৯ হিজরিতে ভর্তি হন পাকিস্তানের কাসিমুল উলুম মুলতানে, দাওরায়ে হাদিস জামাতে। ১৩৯০ হিজরিতে এই মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং সনদ ও ইজাজত লাভ করেন। দাওরায়ে হাদিস পড়া শেষে মুফতি মাহমুদ (রহ.)-এর পরামর্শে হাফেজুল হাদিস আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি (রহ.)-এর কাছে উলুমে তাফসির পড়তে খানপুরে চলে যান। সেখানে ১৩৯০ হিজরির শাবান ও রমজান এই দু-মাসেই পবিত্র কোরআনের পুরো তাফসির সম্পন্ন করেন।

১৩৯১ হিজরিতে পুনরায় দাওরায়ে হাদিস পড়তে নুসরাতুল উলুমে ভর্তি হতে মনস্থির করেন। কিন্তু তত দিনে ভর্তির সময় চলে যায়। তারপরও মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করে নেন। নুসরাতুল উলুমের শায়খুল হাদিস আল্লামা সরফরাজ খান সফদর (রহ.)-এর কাছ থেকে সহিহ বোখারি ও সুনানে তিরমিজির সনদ গ্রহণ করেন।

দেশে ফেরার পর হজরত শায়খে গাজিনগরী ও সদর সাহেব হুজুর (রহ.) ১৩৯৩ হিজরি মোতাবেক ১৯৭৪ সালে তাকে দারুল উলুম দরগাহপুর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরুর পর তার সুনাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অল্পদিনেই ছাত্রদের প্রিয় উস্তাদে পরিণত হন তিনি। তার অভিনব পদ্ধতির পাঠদান, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা, বিশুদ্ধ উচ্চারণ দূর-দূরান্তের ছাত্রদের আগ্রহী করে তোলে। দারুল উলুম দরগাহপুরে তিনি দরসে নেজামির প্রায় সব কিতাব পড়িয়েছেন।

সেই ১৯৯৩ থেকে ১৪৪৫ হিজরি সাল। সময়ের ক্যালেন্ডারে অর্ধযুগ পেরিয়ে গেছে। ৫২ বছর ধরে এখনো দরগাহপুরে দ্বীনের তালিম দিয়ে যাচ্ছেন। তবে বয়স, অতিরিক্ত সফর ও দায়িত্বের কারণে শুধু বোখারির দরস দেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন থেকে তিনি সুনামগঞ্জের পূর্ববাজার জামে মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ ছাড়া আরও কিছু দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে হাদিসের দরস প্রদান করেন।

খান সাহেব হুজুর দীর্ঘদিন দারুল উলুম দরগাহপুরে শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০০ বাংলা সনে মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ তাকে মুহতামিমের দায়িত্ব প্রদান করেন। কিন্তু পদনির্লোভ খান সাহেব হুজুর তখন দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন দরগাহপুর মাদ্রাসায় কয়েক বছর দাওরায়ে হাদিস জামাত ছিল না। তবে ১৪১৪ হিজরিতে পুনরায় দাওরায়ে হাদিসের জামাত খোলা হলে খান সাহেব হুজুরকে শায়খুল হাদিস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

১৪২০ বাংলা সনে তখনকার মুহতামিম মাওলানা মুশাহিদ (রহ.) ইন্তেকাল করলে মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ আবারও তাকে মুহতামিম হিবে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। তখন অনীহা সত্ত্বেও পরিস্থিতি বিবেচনায় গুরুদায়িত্ব তাকে নিতে হয়। সেই থেকে শায়খুল হাদিসের পাশাপাশি মুহতামিম হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তার অসংখ্য ছাত্র দেশ-বিদেশে বিভিন্ন খেদমতে নিয়োজিত আছেন।

শিক্ষাজীবন শেষে তরুণ বয়সেই তিনি ওয়াজ ও বক্তৃতার ময়দানে আলাদা নজর কাড়েন সবার। অনর্গল বিশুদ্ধ উচ্চারণ, মোহনীয় আরবি খুতবা, প্রয়োজনমতো অগ্নিঝরা জ্বালাময়ী বক্তব্য তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সমূহ বাতিলশক্তির বিরুদ্ধে তার ঝাঁজালো বক্তব্য অত্যন্ত কার্যকর। তার বয়ান-ভাষণ এতই মুগ্ধকর যে, শায়খে গাজীনগরী (রহ.) ও সদর সাহেব হুজুর (রহ.)-সহ অনেক গুণিজন গুরুত্ব দিয়ে তার বয়ান শুনতেন। এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওয়াজ-মাহফিলসহ সভা-সমাবেশে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থিত হন। প্রতিদিনই তার প্রোগ্রাম থাকে। চষে বেড়ান দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।

পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে এসে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে কয়েকবার এবং মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুয়তেরও সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন। বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া দেশের প্রাচীন শিক্ষা বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের নায়েবে সদর তিনি। দাওয়াত ও তাবলিগের কাজেও তিনি নিয়মিত সময় দেন। আধ্যাত্মিকতার জগতে কুতবে বাঙাল আল্লামা আমিন উদ্দিন শায়খে কাতিয়া (রহ.)-এর সান্নিধ্য ও খেলাফত লাভ করেছেন।

ছাত্র জামানা থেকেই তিনি লেখালেখি ও দাওয়াতি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ‘মাকামে নবুওয়ত’ নামে একটি গ্রন্থ ছাত্রকালেই আল্লামা রিয়াসত আলী শায়খে চকরিয়া (রহ.)-এর নির্দেশে রচনা করেন। এ ছাড়া ‘হক্ব মাসাইল’ নামে তার একটি গ্রন্থ রয়েছে। মাওলানা নুরুল ইসলাম খান অনেকবার পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন।

দাম্পত্যজীবনে তিনি দুটি বিয়ে করেন। ১৯৭৯ ইংরেজির ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিয়ে করেন ধরমপুর মুল্লাবাড়ীর মাওলানা আব্দুল জব্বার কাসেমি (রহ.)-এর মেয়ে জোবেদা খাতুনকে। কিন্তু বিয়ের পর দীর্ঘদিন পেরোলেও তার কোনো সন্তান না হওয়ায় মায়ের পীড়াপীড়িতে শাখাইতি গ্রামে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টিকেনি। এখনো নিঃসন্তান অবস্থায় প্রথম স্ত্রীকে নিয়েই আছেন।

প্রচারবিমুখ এই বুজুর্গ আলেম সব সময় নিজেকে মিডিয়ার আড়ালে রাখলেও নিয়মিত দেশ-বিদেশের সমসাময়িক বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন। যেকোনো বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনে তার জুড়ি মেলা ভার। তিনি যেমন কারও অযথা সমালোচনা করেন না, তেমনই তাকে নিয়েও এখন পর্যন্ত কথা বলার সাহস হয়নি কারও। যদিও বাতিল প্রতিরোধে তিনি কারও তোয়াক্কা করেন না।

খান সাহেব হুজুর অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করেন। পরিহার করে চলেন আড়ম্বরতা। ফলে হঠাৎ কেউ তাকে দেখলে বুঝতেই পারবে না যে, তিনিই খান সাহেব হুজুর। কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায় চড়ে সফর করেন। বুজুর্গ এই আলেম বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। আল্লাহপাক তাকে আমাদের ছায়া হিসেবে সুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ হায়াত দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত