ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে আমানত

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৬ এএম

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও সঞ্চয় বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষ। তবে এই প্রবণতা শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে বেশি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে পারেনি। গ্রামে শিক্ষার হার কম হওয়ায় ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ডকুমেন্টেশনে ভয় পান তারা। অন্যদিকে গ্রামে গড়ে ওঠা অনিবন্ধিত ও অপ্রচলিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে নামসর্বস্ব এনজিও, সমিতি নামধারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুদের হার বেশি থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এসব খাতকেই সঞ্চয়ের জন্য বেছে নিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এ দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে অপ্রচলিত বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়কারীর হার বেড়ে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ হয়েছে। যেটি ২০১৬ সালেও ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ৬ বছরের ব্যবধানে দেশে এ হার গ্রামে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। মূলত করোনার সময় ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংকে ছয়-নয়ের সুদহার কার্যকরের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয় বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জরিপের তথ্য বলছে, গ্রামে ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ পরিবার এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিজেদের আমানত সঞ্চয় করেছে, যেটি ২০১৬ সালে ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে শহরে এ হার ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ২০১৬ সালে যা ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মানুষের সঞ্চয় বাড়ার ব্যাখ্যায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ হাসনাত আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জরিপে গ্রাম্য অর্থনীতিতেই এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। কারণ গ্রামে এখনো অনেক জায়গা আছে, যেখানে প্রচলিত ব্যাংকব্যবস্থা চালু হয়নি। সেখানে গ্রামের মানুষ ব্যাংকসেবা থেকে বঞ্চিত।

তিনি বলেন, এই মানুষের আর্থিক সহযোগিতা দিতে এনজিও বা অপ্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখে। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেক বিস্তৃত, গত কয়েক বছরে এটি আরও বেড়েছে। গ্রামে প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। সেটি সঞ্চয় করতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের বাসা থেকে ব্যাংক অনেক দূরে থাকে। অনেক জায়গায় ব্যাংকসেবা দিতে গিয়ে এখনো সফল হচ্ছে না। সাধারণত ব্যাংকগুলো এসব জায়গায় এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে যেতে চায়। এ জায়গায় এখনো আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখনো সব জায়গায় পৌঁছায়নি।

শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংক পৌঁছাতে না পারাই অপ্রচলিত প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় বাড়ার মূল কারণ নয়। মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় সেটিকে পুুঁজি করে সুদের হার বাড়িয়ে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত বাড়ায়।

হাসনাত আলম মনে করেন, প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে একটি হিসাব খুলতে মানুষকে অনেক বেশি ডকুমেন্টস দিতে হয়। এজন্য প্রচলিত চ্যানেলে যেতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সুদহার বেশি হওয়ার কারণে মানুষ সেদিকে ঝুঁকছে। সেখান থেকে আপনি যদি ঋণ নেন সুদও বেশি দিতে হয়, অন্যদিকে আমানত রাখলেও ব্যাংকের তুলনায় সুদ বেশি দেয় এসব প্রতিষ্ঠান।

জরিপের তথ্য বলছে, একই সময়ে দেশে ব্যাংক হিসাবধারী প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২২ সাল শেষে দেশে ১৪ দশমিক ১২ শতাংশ পরিবারের ব্যাংক হিসাব আছে। যেটি ২০১৬ সালেও ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে অপ্রচলিত খাতে হিসাবধারী বাড়লেও বড় অংশই সঞ্চয় রাখে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ২০২২ সালে শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত সঞ্চয় করেছে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার, যে হার ২০১৬ সালে ছিল ১৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

তবে ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে পরিবারগুলো। ২০২২ সাল শেষে দেশের ৩৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ পরিবার প্রচলিত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। এটি ২০১৬ সালে ছিল ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

পরিবারপ্রতি গড় ঋণের পরিমাণ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা। গ্রামের মানুষ ঋণ নেন সবচেয়ে কম। গ্রামে প্রতি পরিবারের ঋণ ৪৪ হাজার ১১১ টাকা, যেখানে শহরের পরিবারপ্রতি ঋণ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪৩ টাকা।

অবশ্য চলতি অর্থবছরে ব্যাংকে সুদের হারের সীমা তুলে নেওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে মানুষের সঞ্চয় কমে যাবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ হাসনাত আলম। তিনি বলেন, অপ্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সুদ দিলেও সেখানে ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। আর এখন যেহেতু ব্যাংকের সুদের হারের সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে, ব্যাংকগুলোও সুদের হার বাড়িয়েছে। এখন মানুষ প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই বেশি সঞ্চয় রাখবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত