পুরনোর সঙ্গে নতুন দাবিও আসছে

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:১৩ এএম

২৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৪। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। পুলিশ সপ্তাহ ঘিরে প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়ে এসেছে। পুুুুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নানা বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন।

পুলিশ সপ্তাহকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরে বাহিনীর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রায় একই দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। তবে পুরনো দাবির পাশাপাশি নতুন কিছু দাবিও তোলা হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও পদক দেওয়া হচ্ছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ৩৯৪ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে রাষ্ট্রপতি ও পুলিশ পদক দেওয়া হবে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ভূমিকা রাখায় ৩০ থেকে ৩৫ জেলার পুলিশ সুপারকে পদক দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতি বছরই প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে দাবি উত্থাপন করলেও শুধু আশ্বাস পাওয়া যায়। বেশিরভাগ দাবিই বাস্তবায়ন হয় না। পুলিশের দাবিগুলোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তরিক হলেও প্রশাসনের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায় না।

পুলিশ সূত্র জানায়, সরকারি অন্যান্য দপ্তরে কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা। কিন্তু পুলিশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়। পুলিশ সদস্যরা আট ঘণ্টার অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার দাবি তুলেছেন। বিষয়টি এর আগে একাধিকবার আলোচনা হলেও কার্যকর হয়নি। সরকারের উপসচিবসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর মেজর বা সমমনাসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা বিনা সুদে গাড়ির ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে পুলিশ সুপারসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা এ সুবিধা পান না। তাদের জন্য বিনা সুদে গাড়ি ঋণ সুবিধা দেওয়ার দাবি তোলা হবে এবার। উপকূলীয় থানা ও দ্বীপ এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য দ্বীপাঞ্চল ভাতার দাবি করা হবে। এর আগেও একই দাবি করা হয়েছিল। পার্বত্য এলাকায় পুলিশ সদস্যরা দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করায় তাদের প্রণোদনার অংশ হিসেবে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ অনধিক ৩ হাজার টাকা হারে পাহাড়ি ভাতা পান। এই সিলিং তুলে দিলে পার্বত্যাঞ্চলে কর্মরতদের কাজের আগ্রহ বাড়বে বলে পুলিশ বাহিনী মনে করছে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা সরাসরি সড়কে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয় তাদের। তারা উচ্চরক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অনেক ট্রাফিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ আবার বরণ করেছেন পঙ্গুত্ব। আর এ কারণে ট্রাফিক ভাতা বাড়ানোর দাবি তোলা হবে পুলিশ সপ্তাহে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিসিটিসি) ইউনিটের পুলিশের সদস্যদের জন্য মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উচ্চঝুঁকি ভাতার দাবি তোলা হবে পুলিশের পক্ষ থেকে। বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত সদস্যরা প্রণোদনা হিসেবে ফ্রেশ মানি পান। তবে পুলিশ সদস্যরা এর থেকে বঞ্চিত। এবারও ফ্রেশ মানি দেওয়ার দাবি তুলবে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের স্থানে পুলিশ অধিদপ্তর না লেখা, আইজিপি পদটি ফোর স্টার করা ও পুলিশের জন্য আলাদা মেডিকেল কলেজ করার বিষয়টিও দাবি উত্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, ২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রধানমন্ত্রী আসবেন। তিনি প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করবেন। পরে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে দরবার করবেন প্রধানমন্ত্রী। পুরো সপ্তাহ জুড়ে স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য কয়েকজন মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করবেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাছাড়া পুলিশ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন।

গত বছর ৩ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠে পুলিশ সপ্তাহ হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার তা পেছানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের জন্য বর্তমান সরকার আন্তরিক। পুলিশের যেসব দাবিদাওয়া আছে, তা পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেল পুলিশের নিজস্ব ভবন নেই। এতে বেশ সমস্যা হচ্ছে। কাজের সুবিধার্থে নিজস্ব ভবন জরুরি হয়ে পড়েছে। রেলের অনেক খালি জায়গা আছে। এসব স্থান থেকে রেল পুলিশের জন্য জায়গা বরাদ্দের করার দাবি করা হবে। গত বছরও তা করা হয়েছিল। সাইবার সিকিউরিটি ও সামাজিক মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ ঠেকানোসহ শাস্তি নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের দাবি করা হবে। পাশাপাশি পুলিশকে অধীনস্ত অধিদপ্তর আখ্যা না দিয়ে স্বতন্ত্র পুলিশ বিভাগ গঠন, পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র ইউনিভার্সিটি অব ক্রাইম অ্যান্ড সিকিউরিটি গঠন এবং গ্রেড-১ পদ সৃজনের দাবি করা হবে। তাছাড়া আরও সুপারনিউমারারি পদ বাড়ানো ও সাব-ইন্সপেক্টরদের (উপপরিদর্শক) পদোন্নতির বিষয়টিও আলোচনায় আসবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাইবার অপরাধ রোধ ও তদন্তে শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) আলাদা ইউনিট রয়েছে। কিন্তু জেলার কোথাও নেই। ডিবি পুলিশের একটি অংশ কাজ করে থাকে। একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্ব সাইবার ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। জেলায় নেতৃত্ব দেবেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। তার অধীনে দুজন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), চারজন ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক), আটজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই), ১৬ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টরের (এএসআই) অপারেশনাল টিম থাকবে। এই দাবিও এবার উত্থাপন করা হবে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ব্যাটালিয়নের মূল দপ্তরকে বলা হয় সদর দপ্তর। কিন্তু পুলিশের সদর দপ্তরকে বলা হয় পুলিশ অধিদপ্তর। পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা হলে আইজিপি মন্ত্রণালয়ে বসেই সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানও অর্থ মন্ত্রণালয়ে বসে সিনিয়র সচিবের ভূমিকা পালন করেন। আইজিপির পদটি সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবও একই পদমর্যাদার। পুলিশের ছুটি, বদলির মতো কাজগুলো এখন জননিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমেই করা হয়। পুলিশে চাইছে, এসব কাজ আইজিপির অধীনেই থাকুক। পুলিশকে অধীনস্ত দপ্তর হিসেবে ভাবাটা ঔপনিবেশিক চিন্তা মনে করেন তিনি।

তিন লাখ সদস্যের এ বাহিনীকে পৃথক বিভাগ বা স্বতন্ত্র অধিদপ্তর করার অনুরোধ করা হবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ পরিদর্শক থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকিভাতা বা পুলিশ ভাতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। বিগত কয়েকটি পুলিশ সপ্তাহে পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে দাবি উঠেছে। কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিভাতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ঝুঁকিভাতা পান। পরিদর্শক থেকে তদূর্ধ্বদের ঝুঁকিভাতার বিষয়ে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটিও হয়েছে। কমিটিতে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত সদস্য আছেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই এবারের পুলিশ সপ্তাহের অন্যতম দাবি থাকবে ঝুঁকিভাতা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়গুলো সবই যৌক্তিক। আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি। আমরা এসব দাবির বাস্তবায়ন চাই।’

পুলিশ সূত্র জানায়, ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদক দেওয়ার জন্য এবার ৩৯৪ জনের নাম এসেছে। ইতিমধ্যে তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। যারা পদক পাবেন তারা রাজারবাগে প্যারেড প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরও পুলিশ সপ্তাহে সব জেলার এসপিকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে র‌্যাবের ১৪টি ব্যাটালিয়নের অধিনায়করাও পেয়েছিলেন পুরস্কার। সেবা, সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পুলিশ সদস্যদের সম্মানজনক বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম) দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন বছরের মধ্যে যারা পদক পেয়েছেন তারা এবার পাবেন না। তাদের মধ্যে অনেকেই জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পদকসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে গতকাল বৃহস্পতি বা আজ শুক্রবার। তিনি আরও বলেন, পদকের জন্য তদবিরের পর তদবির হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেউ কেউ এবার পদক পাবেন। তবে ঢালাওভাবে কেউ পাবেন না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর ৭২০ জনের পদোন্নতি চাইলেও কয়েক ধাপে ৩৬৫ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। পদোন্নতি পেলেও পদ না থাকায় আগের পদেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। শুধু বেতনসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পদ বাড়াতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত