টানা চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এমনটিই দাবি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা ও সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর। তারা বলেন, এরই অংশ হিসেবে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসে।
জানা গেছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, শ্রম ও পরিবেশ উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহের কথা জানিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল।
দুদিনের সফরে আসা প্রতিনিধিদলটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে নতুনভাবে সম্পর্কোন্নয়ন শুরুর বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গেও বৈঠক করে প্রতিনিধিদলটি। বৈঠক করে বিএনপির শীর্ষ নেতারা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শ্রমিক নেতাসহ অন্যদের সঙ্গেও। আর এসব বৈঠকই দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ব মোড়ল এ দেশটি সরকারের সঙ্গেও কাজ করতে চায়, আবার বিএনপির সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়। তারা সারা বিশ্বেই একইভাবে বিরোধী দুটি শক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নীতি অনুসরণ করে চলে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সেই নীতিরই কৌশল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতি অনুসরণ করে চলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগেই সর্বনীতি অনুসরণ করে সফল হয়নি, নির্বাচন শেষ করে ক্ষমতার চেয়ারে বসা আওয়ামী লীগকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো কৌশল বা খেলা আর কী প্রভাব ফেলবে?
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে বলেন, ‘বিষয়টি সিম্পল। বিএনপির রাজনীতি চাঙ্গা রাখতে সফরে এসে তারা দলটির নেতাদের গুরুত্ব দিয়েছে। সেই সঙ্গে বিএনপির নেতাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গেও রয়েছে। সুযোগ বুঝে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তত দিনে বিএনপিকে জনসম্পৃক্ত রাজনীতি করে সাংগঠনিক অবস্থান সুসংহত করতে পরামর্শ দিয়েছেন মার্কিনিরা।’
এই নেতা আরও বলেন, ‘মিয়ানমারে তারা দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে যে নীতি অনুসরণ করেছে, বাংলাদেশেও একই নীতি তাদের।’
তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের প্রতি ক্ষুব্ধ। তারেকের নেতৃত্বে বিএনপিকে বেশিদূর এগোতে দিতে রাজি নয়। আপাতত দেশটির চাওয়া অনুযায়ী তারা রাজি হলে ভারতের অবস্থান বিএনপির পক্ষে আনতে সক্ষম হবে যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়েও একটি পরামর্শ বিএনপিকে দিয়ে রেখেছে দেশটি (যুক্তরাষ্ট্র)। রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ ও ভারতের চাওয়া এই দুটি ইস্যুতে বিএনপি নেতাদের প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ থাকতে পারে এই সাক্ষাতে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও সরকারকে চাপে রাখার কৌশলও হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের অন্তরালের কারণ।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি ও এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের সফর ইতিবাচক।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্কিন প্রতিনিধিদল যাদের সঙ্গে দেখা করেছে বুঝতে হবে সেসব বিষয় দেশটির কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন তাদের অগ্রাধিকার বিষয়। সালমান এফ রহমানের সঙ্গে দেখা করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ককে তারা কাজ করতে চায় বলে বোঝাতে চাইছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এলিন লাউবাকের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসসি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং এনএসসি হচ্ছে হোয়াইট হাউজের একটি অংশ। তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর শুরু করাটা ইঙ্গিত করে যে তারা নিরাপত্তা বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তা ছাড়া, মিয়ানমারে চলমান সংকট সম্পর্কে বাংলাদেশ কী ভাবছে, সেটি সম্পর্কে পরিষ্কার হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গা ইস্যু ও তাদের প্রত্যাবাসনে এর কী প্রভাব পড়তে পারে আলোচনায় সেটিও থাকবে। এ ছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে তাদের নিজস্ব কৌশল আছে, প্রতিনিধিদলের আলোচনায় তা থাকবে অবশ্যই।’
এর আগে গত রবিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল নৈশভোজে অংশ নেন।
