মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর

নতুন সম্পর্কের সূচনা দেখছে সরকার

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:১৩ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশের টানাপড়েন এবং দরকষাকষি প্রকাশ্যই ছিল। তবে ওই নির্বাচনের তফসিলের পর থেকেই অনেকটা চুপ হয়ে যায় ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে আলোচনায় আসে নির্বাচনের পর কী হবে? শ্রম আইন ও শ্রমিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলে পড়তে পারে নতুন সরকার। এ আলোচনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা স্বীকৃতি দেবে না।

সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসনের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলের সফরে আবারও সেই আলোচনা হচ্ছে। যদিও নির্বাচন নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তাদের নানা পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠিও দিয়েছেন। গত রবিবার সরকারপ্রধান ওই চিঠির জবাব দিয়েছেন।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের পর মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধিদলের এ সফর হলো নতুন সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা শুরুর একটা অধ্যায় মাত্র। তারা নির্বাচন ছাড়াও নিরাপত্তা ইস্যু, শ্রমিক অধিকার ও এ সংক্রান্ত আইন এবং মানবাধিকার নিয়ে গত দুই বছর থেকেই কথা বলছে। এ ছাড়া ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশল নিয়ে তাদের বড় আগ্রহ এবং স্বার্থ রয়েছে। ফলে তারা এ আলোচনাগুলো করেছে। বরাবরের মতো এ সফরেও প্রতিনিধিদল বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিরোধীপক্ষ বিএনপি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আবার জলবায়ু নিয়ে যে তাদের আগ্রহ রয়েছে, সেটিও বন ও পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এ সফরের পর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য থেকে কিছুটা আঁচ করা যাবে কোন বিষয়ে তারা বেশি জোর দিচ্ছেন। তবে এটা বলা যায়, নির্বাচন নিয়ে যাই ঘটে থাকুক, নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিনিধিদলের সফর আমি অবশ্যই স্বাগত জানাই। যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রভাবশালী দেশ। সেই দেশের প্রশাসনিক প্রতিনিধিদল যখন বাংলাদেশ সফরে এসেছে এবং মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদর সঙ্গে বৈঠক করছে সেটিও গুরুত্ব রাখে। তবে এটা নিয়ে বেশি কিছু বলার মতো সুযোগ হয়নি। আমরা দেখছি যুক্তরাষ্ট্র অনেক বিষয়ে সুযোগ দিতে চায়। এখন তাদের ওইসব সুযোগ নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের কতটুকু আছে সেটিও দেখতে হবে। আমরা তা কীভাবে কাজে লাগাব। নির্বাচনের বাইরেও ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক ইস্যুতে যুক্ত রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি প্রতিনিধিদল পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে। তাতে বোঝা যায় তারা জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছে। অর্থাৎ তারা অর্থনৈতিক বিষয়েও কাজ করতে চায়।’

সালমান এফ রহমান এ প্রতিনিধিদলের সফর এবং তার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চায়। সেই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, শ্রম পরিবেশ উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ সফরে প্রতিনিধিদল বরাবরের মতো সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তা, সরকারের বিরোধীপক্ষসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। যেসব ইস্যুতে দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছে তা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের সঙ্গে তারা আলোচনা করেছে। কোন বিষয়ে তারা বেশি সোচ্চার সেটি পরবর্তীকালে বোঝা যাবে।’

গত শনিবার ইউএসএআইডির এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মাইকেল শিফার এবং ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আফরিন আখতার ঢাকা আসেন। পরদিন রবিবার প্রতিনিধিদলের নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসসি) দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ডিরেক্টর এলিন লাউবাকের শ্রীলঙ্কা থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান। দুদিনের সফরে দলটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করে। এ ছাড়া বিএনপির নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শ্রমিক নেতাসহ অন্যদের সঙ্গেও বৈঠক করে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। ড. হাছান বলেছেন, সরকারের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। মিয়ানমারে চলমান ঘটনা এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ কী ভাবছে, সেটিও জানতে চেয়েছেন হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা ইস্যু এবং তাদের প্রত্যাবাসনে এর কী প্রভাব পড়বে তাও আলোচনায় এসেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত