প্রবাসী আয়ের পর এবার রপ্তানিতেও প্রবৃদ্ধির সুখবর এলো। সদ্য শেষ হওয়া মাস ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৫১৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। ডলার সংকটের মধ্যে এ মাসে প্রবাসী আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ, ৩৮ শতাংশ।
চলতি বছরের শুরুর মাস জানুয়ারিতে ৫৭২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল আর প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। টানা দুই মাস পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির হারও কিছুটা বেড়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় তার আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল সোমবার পণ্য রপ্তানির এই হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, তৈরি পোশাক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে অন্য বড় খাত যেমন হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৬৪ কোটি ডলারের। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এ নিয়ে টানা তিন মাসে রপ্তানি আয় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক পেরিয়েছে। এর আগের মাস জানুয়ারিতে রেকর্ড ৫৭২ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের সমপরিমাণ পণ্য বিদেশে বিক্রি করা হয়েছিল। ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ৫৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
গতকাল সোমবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৫১৮ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ৪৬৩ কোটি ডলারের। অর্থাৎ ৫৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ১২ শতাংশ বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির প্রবৃদ্ধিতে ভর করে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে রপ্তানিও আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়ে প্রায় পৌনে ৪ শতাংশ হয়েছে।
ইপিবির তথ্য বলছে, উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি হলেও একক মাসের হিসাবে ফেব্রুয়ারিতে সরকার নির্ধারিত রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। গত মাসে ৫২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে আয়ের পরিমাণ কম শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ।
আট মাসের হিসাবেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি রপ্তানিতে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল বাংলাদেশ। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১১১ কোটি ডলার। এর বিপরীতে আয় এসেছে ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি ডলার। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প থেকে এসেছে ৩ হাজার ২৮৫ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কমেছে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। এই আট মাসে পোশাক খাত থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৪৬৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ১ হাজার ৮৫৯ কোটি ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে লক্ষ্যের চেয়ে আয় কমেছে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ১ হাজার ৪২৬ কোটি ডলার; গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আয় কমেছে দশমিক ২৬ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ইপিবির হিসাব বলছে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি, এই আট মাসে মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ দশমিক ৪৫ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে।
প্রথম আট মাসে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক হলেও অন্য খাতেও দেশের রপ্তানি আয় ধীরে ধীরে বাড়ছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৬৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার হয়েছে। কৃষিপণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্জন ফল রপ্তানিতে। চলতি অর্থবছর দেশের ফল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১১ লাখ ডলার। কিন্তু আট মাস শেষে দেশের ফল রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এ সময় ওষুধ রপ্তানিতেও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ওষুধ রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতেও প্রায় ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বিপরীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়ের খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। আলোচিত সময়ে এ খাতের পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ৭১ কোটি ২৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। ধারাবাহিকভাবে কমছে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পাট রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৫৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ কম।
এদিকে সংকটের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে চমক দেখা দিয়েছে। জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারি মাসেও ২১০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর এর ফলে দেশের অর্থনীতির আলোচিত ও উদ্বেগজনক সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বেশ খানিকটা বেড়েছে।
