কেন্দ্রভাড়া না কমিয়ে ভোক্তার ঘাড়ে ভর্তুকির ভার

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৮:০৯ এএম

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও খোরপোশ (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্রভাড়া) সমলয়ে বাড়ছে। কেন্দ্রভাড়া না কমিয়ে ভর্তুকি সমন্বয়ের কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সরকার এর দায় ভোক্তার ঘাড়ে চাপাচ্ছে, যা অযৌক্তিক।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রক্রিয়াগত ও নীতিগত দুর্বলতা এবং বেশিমাত্রায় বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝোঁকার ফলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে পিডিবির আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। বাড়ছে সরকারের ভর্তুকিও।

গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, এর প্রভাব, বিকল্প উপায় ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরতে সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে ‘সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ভর্তুকি সমন্বয়ে অন্য বিকল্প আছে কি’ শীর্ষক ওই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণে পিডিবির আর্থিক ক্ষতি যেমন বাড়ছে তেমনি সরকারের ভর্তুকিও বাড়ছে। ভর্তুকি বাড়ার আরেকটি কারণ উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা। এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণেও ব্যয় বাড়ছে। প্রতিযোগিতার অভাবের কারণেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কিনছে। এখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। তিনি বলেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও ঘটছে বলে আমাদের আশঙ্কা। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ কিনলে সরকারের ওপর ভর্তুকির পরিমাণ অনেক কমত।’

তিনি জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ক্যাপাসিটি পেমেন্টও প্রায় কাছাকাছি ছিল। নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলেও যদি এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে সেটি সরকারের জন্য বড় দুর্ভাবনার কারণ হবে।

‘সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে সমন্বয় বলছে। বাস্তবতা হলো এটি মূল্যবৃদ্ধি। ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে এটা করেছে সরকার। এর ফলে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে’ যোগ করেন তিনি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, ‘অযৌক্তিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সমন্বয় করা গেলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দরকার হতো না। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে ভর্তুকি কমানো যায় তা সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সরকার এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এক বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। বলা হচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এটি দুশ্চিন্তার কারণ। এরকম হলে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠবে।’

মূল্যবৃদ্ধিতে বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কেন? এমন প্রশ্নে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আইনের ধারা পরিবর্তন করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে পাশ কাটিয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাগুলো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছে। কমিশনের স্বাধীনতাও ক্ষুন্ন হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। কমিশন মূল্যবৃদ্ধির আগে গণশুনানিতে বিভিন্ন কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাব দিত। মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরত। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে। কিন্তু নির্বাহী আদেশের কারণে জবাবদিহি ক্ষুন্ন হয়েছে। গণতান্ত্রিক একটা দেশে এটা কাম্য নয়। আগামীতে অবশ্যই কমিশনের মাধ্যমে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হবে আশা করি।’

মূল্য সমন্বয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। কোনো সমন্বয় নেই। চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি বেড়েছে। ক্যাপাসিটির উল্লম্ফন হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। এটা সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বিদ্যুতের বিল কী পরিমাণ বাড়বে তা জানতে সারা দেশে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এক হাজার বাসাবাড়িতে জরিপ চালিয়েছে সিপিডি। জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, সর্বশেষ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি পরিবারে মাসিক ব্যয় গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়লে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার কারণে ব্যয় আরও বাড়বে। ক্ষুদ্র শিল্পে বাড়বে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ, ব্যবসায় ও অফিসে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ,  শিল্পে ১০ শতাংশ এবং সেচে বাড়বে ১১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।

তিনি বলেন, কৃষিতে বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়া বড় অভিঘাত। বর্ধিত বিদ্যুতের বিলের কারণে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেশি থাকবে। এর দায় ভোক্তার ওপর পড়বে। ভোক্তা এজন্য প্রস্তুত নয়। অযৌক্তিক দায় তাদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারের মাত্র ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে। এরপরও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার যদি পুরো ভর্তুকি মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয় করে তাহলে বিদ্যুতের দাম বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১৬ টাকা ৪০ পয়সা হবে। এটি আরও বাড়বে।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি সমন্বয়ের স্পষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করা দরকার এবং দায় ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে। সিপিডি চারটি বিকল্প প্রস্তাবের কথা বলে। এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভর্তুকি সমন্বয় করা সম্ভব।

বিকল্প প্রস্তাবগুলো হলো সময়মতো বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ফেজ আউট (বন্ধ) করা, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের নবায়নের ক্ষেত্রে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ (বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে বিল নয়) শর্তে চুক্তি করতে হবে, ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের সামান্য মূল্যবৃদ্ধি এবং ফেজ আউট করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এ চারটিকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার যদি তার পরিকল্পনা ঠিক করে তাহলে ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে আর ভর্তুকি দিতে হবে না। সরকার যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় তাতেও বিপুল লাভ হবে। সেই সঙ্গে বিশেষ ক্ষমতা আইন রহিত করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেনা দরকার।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি, মাশফিক আহসান হৃদয়, প্রোগ্রাম সহযোগী ফয়সাল কাইয়ুম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত