বাঁচার আকুতি ফেরার আর্জি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩০ এএম

বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। গত মঙ্গলবার ২৩ জন নাবিকসহ জাহাজটি জিম্মি করার পর সেটিকে সোমালিয়ার উপকূলের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করেছে। জাহাজে থাকা নাবিকদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়াসহ যোগাযোগের সব উপায় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে তারা। এর আগে অবশ্য জাহাজটির কর্মকর্তা ও নাবিকরা পরিবার এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কেউ সরাসরি কথা বলতে পেরেছেন, কেউবা শুধু বার্তা পাঠাতে পেরেছেন। জিম্মি নাবিকদের সবাই জানিয়েছেন বাঁচার আকুতি। বলেছেন, যত দ্রুত দস্যুদের দাবি করা অর্থ পরিশোধ করা হবে, তত দ্রুতই তারা মুক্তি পাবেন। আর তা না হলে একে একে সবাইকেই মরতে হবে জলদস্যুদের হাতে।

এদিকে জিম্মি ওই নাবিকদের স্বজনরাও আকুতি জানিয়েছেন তাদের ফিরিয়ে আনতে। এজন্য তারা জাহাজটির মালিকপক্ষ ও সরকারের কাছে স্বজনদের সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

জিম্মি হওয়া জাহাজের থাকা নাবিক ও ক্রুরা হলেন জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খান, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, থার্ড অফিসার এন মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এএসএম সাইদুজ্জামান, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলাম, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ, ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান, ইলেকট্রিশিয়ান ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ, ক্রু মো. আনোয়ারুল হক, মো. আসিফুর রহমান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, জয় মাহমুদ, মো. নাজমুল হক, আইনুল হক, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, মো. আলী হোসেন, মোশাররফ হোসেন শাকিল, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. নুর উদ্দিন ও মো. সালেহ আহমদ। তাদের মধ্যে ১১ জনই চট্টগ্রামের। এ ছাড়া ফরিদপুরের এক, টাঙ্গাইলের এক, নওগাঁর এক, খুলনার এক, নেত্রকোনার এক, লক্ষ্মীপুরের এক, সিরাজগঞ্জের এক, নোয়াখালীর দুই, ফেনীর এক, নাটোরের এক ও বরিশালের একজন রয়েছেন।

আমাদের সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন ওইসব নাবিকের মধ্যে কয়েকজন স্বজনের সঙ্গে। চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটছে জিম্মি নাবিকের স্বজনদের। জাহাজ থেকে পাঠানো নাবিকদের অডিও বার্তা শুনে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা। জাহাজ মালিক ও সরকারের কাছে তাদের আকুতি, যেকোনো মূল্যে জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার করে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। বুধবার সকালে নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড়ে এমভি আবদুল্লাহর মালিক প্রতিষ্ঠান কবির গ্রুপের অফিসে গিয়ে এমন আকুতিই জানিয়েছেন নাবিকদের স্বজনরা।

জলদস্যুর কবলে পড়া জাহাজটির চিফ অফিসার আতিক উল্লাহর পাঁচ বছরের মেয়ে উনাইজা মোবাইল ফোন কানে লাগিয়ে বাবার পাঠানো অডিও মেসেজ শুনে মনে করছে বাবা তার সঙ্গে কথা বলছে। মোবাইল কানে লাগিয়েই বলছে ‘বাবা তুমি কবে আসবা।’ অবুঝ এ শিশু জানে না তার বাবার মহাবিপদের কথা। অডিও মেসেজ পাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী মিনা আজমিন। ছেলের বিপদে কাতর হয়ে পড়েছেন মা শাহনুর বেগম। তার একটাই কথা ‘আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।’

বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির এক্স ক্যাডেট আতিক উল্লাহর বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বরকল এলাকায়। ঘরে রয়েছে মা, ভাই, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তিনটি ফুটফুটে শিশুকন্যা। পরিবার নিয়ে থাকেন নগরীর নন্দনকানন এলাকায়। বুধবার বিকেলে বাসায় গিয়ে দেখা যায় সেখানে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও এসেছে আত্মীয়স্বজনরা। আতিকের বাড়িতে কথা হয় তার নিকটাত্মীয় ওমর ফারুকের সঙ্গে। জাহাজ দস্যুদের কবলে পড়ার পর মঙ্গলবার দুই দফা অডিও বার্তা পাঠিয়ে সেখানকার অবস্থা জানিয়েছেন আতিক। সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি বলেছিলেন, জলদস্যুরা সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে। তার ফোনও নিয়ে ফেলবে, হয়তো আর কথা হবে না। এরপর থেকে আর কথা হয়নি। এ খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েন আতিকের স্ত্রী মিনা আজমিন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আতিকের মা শাহনুর আকতার বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই। আমার তিন অবুঝ নাতনি তাদের বাবাকে ফিরে পেতে চায়। সরকারের কাছে একটাই চাওয়া যেভাবেই হোক জাহাজ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’

কান্না থামছে না দস্যুর হাতে জিম্মি নাবিক আসিফ উর রহমানের বাবা আকতার হোসেনের। ছেলের খবর জানতে বুধবার সকালে ছুটে যান কবির গ্রুপের অফিসে। সেখানেও আকুতি জানান ছেলেকে উদ্ধারের। এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, মাত্র তিন বছর আগে জাহাজের চাকরিতে যোগ দেয় আসিফ। গত ডিসেম্বরে সর্বশেষ জাহাজে ওঠে।

আসিফের ভগ্নিপতি মো. সালাহ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বুধবার বিকেলেও মেসেঞ্জারে কল দিয়ে কথা বলেছে আসিফ। সে জানিয়েছে, তাদের সবাইকে অস্ত্রের মুখে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে। তার দুটি মোবাইলের মধ্যে একটি দস্যুরা নিয়ে গেছে। আরেকটি গোপনে রেখে দিয়েছে সে। ফোনে আসিফ জানিয়েছে, তাদের কোনো মারধর করা হয়নি, যথারীতি সাহরি ও ইফতারিও করছে তারা। তাদের জাহাজটি দস্যুরা সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানায় আসিফ।’

দস্যুকবলিত জাহাজটির আরেক নাবিক শামসুদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। তার স্ত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে শামসুদ্দিন ফোন করে জানায়, জাহাজে জলদস্যু ওঠার চেষ্টা করছে। জানি না কী হয়, দোয়া করিও। এর পরপরই আবার ফোন করে বলে, জলদস্যুরা মোবাইল নিয়ে ফেলছে আর কথা হবে না। এর পরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’ ফারজানা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘তার কিছু হয়ে গেলে আমি তিন মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাব। আমি স্বামীকে ফিরে পেতে চাই।’

খুলনা থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, এমভি আবদুল্লাহর সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার (দ্বিতীয় প্রকৌশলী) খুলনার মো. তৌফিকুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। তৌফিকুল ইসলাম খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ২০/১ করিমনগর এলাকার মো. ইকবাল এবং দিল আফরোজা দম্পতির ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

গতকাল দুপুরে তৌফিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা মো. ইকবাল বাড়িতে নেই। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই কানে আসে কান্নার আওয়াজ। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তৌফিকুলের স্ত্রী জোবাইদা নোমান। পাশে বসে চোখ মুছছেন ৭২ বছর বয়সী মা দিল আফরোজা।

জোবাইদা নোমান বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে কথা বলার আগে দুপুর ২টার দিকে যোগাযোগ হয় স্বামীর সঙ্গে। এ সময় তৌফিক জলদস্যুদের কবলে পড়ার বিষয়টি মা-বাবাকে জানাতে নিষেধ করে। একই সঙ্গে তার জন্য দোয়া করার কথাও বলে।’

জোবাইদা বলেন, ‘দুপুর ২টায় ও (তৌফিক) প্রথমে ফোন দিয়ে জানায়, আমাদের জাহাজ জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। আমাদের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ক্যাপ্টেন স্যারকে ক্যাপচার করে নিয়েছে। দোয়া করো। আমাকে মাফ করে দিও। পরে বিকেল ৫টায় আবার ফোন দিয়ে বলেছে আমাদের সোমালিয়ায় যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এখন আমরা সোমালিয়ার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছি। যেতে তিন দিন লাগবে। তারপর থেকে আর যোগাযোগ নেই।’

কাঁদতে কাঁদতে তৌফিকের মা দিল আফরোজা বলেন, ‘ছেলেকে জিম্মি করার কথা শোনার পর তাকে কয়েকটি দোয়া পড়ার কথা বলি। তখন সে আমাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কথা বলার একপর্যায়ে জলদস্যুরা তার ফোন কেড়ে নেয়। তৌফিকের সাত বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া তাহসিনা ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আহমদ মুসাফি বাবার জিম্মি হওয়ার খবর শোনার পর থেকেই অঝোরে কাঁদছে।’

ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, জিম্মি তারেকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালীর ছকড়িকান্দি গ্রামে। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানকে ফিরে পেতে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন বাবা-মা। প্রতিবেশী ও স্বজনরাও বাড়িতে ভিড় করেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, তারেকুল খুবই নম্র ও ভদ্র একটি ছেলে। তার মা জানান, সাত বছর বয়স থেকে কখনো নামাজ-রোজা বাদ দেয়নি তারেক। এমন একটি সোনার ছেলের এমন দুর্দশার খবরে এখনো কেঁদে চলছেন তার মা। ছেলের ছবি দেখে কান্না করছেন আর তারেককে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছেন তিনি।

জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মো. দেলোয়ার হোসেনের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট মো. তারেকুল ইসলাম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে পাস করে চলে যান ঢাকায়। সেখানে মিরপুরের ড. মো. শহীদুল্লাহ কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ২০১২ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে। ২০১৪ সালে নটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরিতে যোগ দেন তারেকুল।

বরিশাল প্রতিনিধি জানান, জলদস্যুদের কবলে পড়া ২৩ নাবিকের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়নের উপারেরপাড় গ্রামের আলী হোসেন। তার স্বজনরা জানান, গত মঙ্গলবার বিকেলে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন নাবিক আলী হোসেন। সেখানে লিখেছেন আমরা কিডন্যাপড হয়েছি, মুক্তি পাওয়ার আগে আর যোগাযোগ হবে না!

আলী হোসেনের পরিবারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই মেসেজ পেয়েও প্রথমে পরিবারের সদস্যরা কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। পরে টেলিভিশনের সংবাদে জানতে পারেন বাংলাদেশি জাহাজ আবদুল্লাহ দখল করে নিয়ে গেছে সোমালিয়ান জলদস্যু। ততক্ষণে পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আলী হোসেনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিকের মধ্যে নাজমুল হক হানিফ নামে এক নাবিক রয়েছেন। তিনি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের নুরনগর গ্রামের কৃষক আবু সামা শেখ ও নার্গিছ বেগম দম্পতির ছেলে। গত মঙ্গলবার বিকেলে নাজমুলের আটকের খবর পৌঁছায় তার গ্রামের বাড়ি কামারখন্দের নুরনগর গ্রামে। খবর পেয়ে বারবার কান্না ও আহাজারিতে মূর্ছা যান তার মা নার্গিছ বেগম। দুশ্চিন্তায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন তার বাবা আবু সামা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত