প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রবিরাগের পরিচালক সাদী মহম্মদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাদী মহম্মদের ভাই নৃত্যশিল্পী শিবলী মহম্মদ গণমাধ্যমকে জানান, গতকাল তানপুরা নিয়ে সংগীত চর্চা করছিলেন তিনি। সন্ধ্যার পর হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ দেখেন। কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সদ্যপ্রয়াত সাদী মহম্মদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপা গণমাধ্যমকে বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাদী মহম্মদ মারা গেছেন।
গত বছরের জুলাই মাসে সাদী মহম্মদের মা জেবুন্নেছা মারা যান। শামীম আরা নীপা বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর থেকেই সাদী মহম্মদ মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। আজ (গতকাল) রোজা রাখলেন। ইফতারও করলেন। এরপরই না ফেরার দেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করছি।’
মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তোফাজ্জল হোসেন জানান, বাসায় যে ঘরে বসে সাদী মহম্মদ গান করতেন, সেখানেই তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। বাসার লোকজন ডাকাডাকি করে তার সাড়া পায়নি। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঝুলন্ত লাশ দেখতে পায়। খবর পেয়ে রাত ৮টার দিকে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
গতকাল রাত ১০টার দিকে সদ্যপ্রয়াত সাদী মহম্মদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নৃত্যশিল্পী স্নাতা শাহরিন, অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ, নাট্যনির্দেশক পান্থ শাহরিয়ারসহ অনেকে সাদী মহম্মদের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছেন।
সাদী মহম্মদের বাবা সলিমউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে শহীদ হন। ১৯৭১ সালে তার মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের সি-১২/১০ বাড়িটি ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার। শহীদ সলিমউল্লাহর ছেলে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সাদী মহম্মদ এবং নৃত্যশিল্পী শিবলী মহম্মদ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে খুবই চেনা মুখ।
সলিমউল্লাহ ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ছিল সখ্য। একাত্তরের ২৩ মার্চ মোহাম্মদপুরের বাসার ছাদে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন তিনি।
২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিনই অবাঙালিরা ওই বাড়িতে চড়াও হয়ে আগুন দেয়। গুলি করে হত্যা করা হয় সলিমউল্লাহসহ তার পরিবারের কয়েকজনকে। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে তার নামেই ঢাকার মোহাম্মদপুরের সলিমউল্লাহ রোডের নামকরণ করা হয়।
বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্রসংগীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা সাদী মহম্মদ একাধারে শিল্পী, শিক্ষক ও সুরকার ছিলেন। ২০০৭ সালে ‘আমাকে খুঁজে পাবে ভোরের শিশিরে’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০০৯ সালে তার ‘শ্রাবণ আকাশে’ ও ২০১২ সালে তার ‘সার্থক জনম আমার’ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। অসংখ্য সিনেমা ও নাটকে প্লেব্যাক করেছেন সাদী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন রবিরাগের পরিচালক।
তবে গত কয়েক বছর ধরে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না সাদীকে। গত বছর জুলাই মাসে মারা যান সাদী-শিবলীর মা বেগম জেবুন্নেসা সলিমউল্লাহ। তারপর থেকে সাদী নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য।
নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা তো বুঝতে পারিনি কোন অভিমান বুকে চেপে রেখেছিলেন? এমন একটি কাজ করলেন, আমরা স্তব্ধ। শুধু বলব, সবাই ওনার জন্য দোয়া করবেন। অনেক ভালো একজন মানুষ ছিলেন। তার এমন মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।’
শিবলী মহম্মদ জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবার বাদ জোহর বাসার পাশে তাজমহল রোড কবরস্থানে দাফন করা হবে তার ভাইকে। তার আগে কবরস্থান জামে মসজিদেই জানাজা হবে।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসা আমার ভাই পেয়েছেন। এই যে এত মানুষ এখানে ছুটে এসেছেন। এটাই আমার ভাইয়ের প্রতি সবার ভালোবাসা। মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়া হবে না। মরদেহ রাতে হিমঘরে রাখা হবে। সেখান থেকে কাল আনা হবে।’
