সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে শুধু সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বা বার নির্বাচনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা লাগাতারভাবে সরকারপন্থিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যাচ্ছেন। সংগঠনটির শীর্ষ পদগুলোতেও দাপট ছিল তাদের। গত বছর নির্বাচনে সহিংসতা ও কোণঠাসা হয়ে যাওয়ার পরও এবার মাঠে ছিলেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। তাদের সঙ্গে প্যানেলে ছিলেন জামায়াতপন্থিরাও। গত বছর একটি পদেও জেতেনি বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের নীল প্যানেল। এবার সভাপতিসহ চারটি পদে জিতেছেন তারা।
সুপ্রিম কোর্টে যখন এমন চিত্র, তখন অন্য পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন বয়কট করছেন বিএনপিপন্থিরা। ফলে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ভোটের জৌলুশ আর নেই।
বিএনপিপন্থিদের ভাষ্য, পরিস্থিতি যখন জাতীয় নির্বাচনের মতো একপেশে, তখন বয়কট না করে উপায় কী?
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত বিএনপিপন্থিদের। কেননা, ভোট হলো কৌশলের খেলা। সব সময় একই কৌশল সাফল্য বয়ে না-ও আনতে পারে। এ কারণে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিকল্প কী কী হতে পারে তা-ও পরিকল্পনায় থাকা উচিত।
সর্বশেষ চলতি মাসে অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২৪-২৫ মেয়াদের কার্য নির্বাহী কমিটির প্রতিনিধি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। তবে ভোটগণনা নিয়ে হট্টগোল, মারামারি, মামলা, গ্রেপ্তারের মতো নানা নাটকীয়তার পরও সভাপতিসহ ৪টি পদে বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা জয় পেয়েছেন। সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাও। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের সাদা প্যানেল পেয়েছে সম্পাদকসহ ১০টি পদ। এর আগের মেয়াদে নির্বাচন ঘিরে হামলা, সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ভোটে ১৪টি পদের সবগুলোতে জয়লাভ করে আওয়ামীপন্থি প্যানেল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে এবং তাদের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে সারা দেশে সব পেশাজীবীর মধ্যে বিভাজন চলছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আইনজীবী, শ্রমিক, সাংবাদিক সবাই রাজনৈতিক মতাদর্শে ভাগ হয়ে সংগঠন পরিচালনা করছেন। আর ক্ষমতার রাজনীতিতে আপেক্ষিক সুবিধা লাভের আশায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিয়ত পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে। এতে করে পেশাদারিত্ব মূল্যায়ন হচ্ছে না। ফলে ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়েছে পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে।
বাংলাদেশে পেশাজীবীরা মোটাদাগে সরকারি দল আর বিরোধী দলে বিভক্ত। এতে কোনো রাখঢাক নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেলের একটি আওয়ামী লীগ সমর্থিত, অন্যটি বিএনপি সমর্থিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতিসহ কয়েকটি পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন বয়কট করতে দেখা গেছে বিএনপিপন্থিদের।
নির্বাচনে কেন অংশ নেন না এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতাদের ভাষ্য, মাথায় পচন ধরলে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে সেটা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। ভোট দেওয়ার পরিবেশ, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের নানা চাপ, সাধারণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি না করাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ তারা উল্লেখ করেন।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকারদলীয়রা প্রতিটি পেশাজীবী সংগঠনকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। এমন কোনো সংগঠন নেই, যেখানে তারা হামলা-মামলা, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে না। দুই-একটি জায়গায় এখনো নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বিএনপিপন্থিরা নির্বাচন করছে। পরিস্থিতি যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে হয়তো সেগুলোও বর্জন করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’
বাংলাদেশে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতি, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ বা (আইইবি), কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ বা কেআইবি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) উল্লেখ্যযোগ্য।
তথ্য বলছে, প্রধান ৮টি সংগঠনের মধ্যে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (দুই অংশে বিভক্ত), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতি, আইইবির নির্বাচন নিয়মিত হয়। বিএনপিপন্থিরা আইইবির নির্বাচন প্রায় এক দশক ধরে বয়কট করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতির নির্বাচনও কয়েক বছর ধরে বর্জন করে আসছেন বিএনপিপন্থিরা। প্রায় ছয় বছর ধরে নির্বাচন হয় না কেআইবি ও বিএমএর।
জানা গেছে, চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন হওয়ার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএমএ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সভায় হয়েছে বলে সংগঠনটির মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন। অথচ বর্তমান যে কমিটি আছে, সেটি ২০১৬ সালের; অর্থাৎ সাত বছর আগের কমিটি। বিএমএ নির্বাচনে বিএনপি সর্বশেষ অংশ নিয়েছিল ২০১২ সালে। ২০১৬ সালের নির্বাচনও বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ড্যাব।
কেন এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে ড্যাবের নেতা ও বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের একজন সদস্যকে সিভিল সার্জনের সামনে যখন ভোট দিতে হয়, তখন তিনি নিজের পোস্টিং ঠিক রাখতে কি সরকারি দল সমর্থিত প্যানেলের নেতাদের ভোট দেবেন, নাকি নিজের মতো করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন?’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘কেউ সরকারপন্থিদের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়, ফলে তিনি আর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান না। এ জন্যই আমরা বলেছি, নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের মতো ভিন্নপন্থায় মেরে-কেটে নেওয়ার মতো নির্বাচন আয়োজন করলে সেখানে অংশ গ্রহণ করা বা না করা একই কথা।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে যেটা হয়েছে, সেটা বিএমএর নির্বাচনেও আগে হয়েছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, সে জন্য ড্যাবের সব সদস্যের সিদ্ধান্তে নির্বাচন বর্জন করা হচ্ছে।’
করোনা পরিস্থিতির পর ২০২১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন বর্জন করে আসছেন বিএনপিপন্থিরা। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল বর্জন করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের প্রার্থীরা।
কেআইবির ২০১৭-১৮ সালের কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চার বছরের বেশি সময় আগে। দুই বছরের সেই কমিটি ছয় বছরের বেশি সময় ধরে বহাল। ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এনে এক কৃষিবিদ আদালতের দ্বারস্থ হলে নির্বাচন আটকে আছে। কেআইবির সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ওই নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি সমর্থিত কৃষিবিদদের সংগঠন অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব)।
আইইবির ২০২৩-২৪ মেয়াদের নির্বাচনেও বিএনপিপন্থিরা অংশ নেননি। সর্বশেষ ২০১২ সালে বিএনপিপন্থি প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ওই সময় ৩০টি পদের মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বেশিরভাগ পদে তারা জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে সংগঠনটিও আর নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
অ্যাবের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হাছিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশের প্রকৌশলীদের নিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সবার মত হচ্ছে, ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করতে না পারলে সেখানে গিয়ে লাভ নেই। নানা কায়দা করে হয়তো দুই-একটি পদে জয়ী হওয়া যাবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠন করা, সদস্যদের কল্যাণে অ্যাবের যে রাজনীতি, সেটা তো আর হয়ে উঠবে না। তাই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।’
