এনডিআই-আইআরআই

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে গুণগত মান রক্ষা হয়নি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ০৩:০১ এএম

বিরোধীদের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এবারের জাতীয় নির্বাচনে আগের তুলনায় সহিংসতা কম হলেও গুণগত মান ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক করতে হলে সবপক্ষকে অহিংস রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গত শনিবার প্রকাশ করা এনডিআই ও আইআরআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

এ প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচনের মান বাংলাদেশের অতীতে যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উন্নত ছিল। এনডিআই-আইআরআই কী বলল বা না বলল, এতে কিছু আসে যায় না।’

আইআরআই এবং এনডিআই হলো নির্দলীয় ও বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান দুটি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অনুশীলনকে সমর্থন ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করে। গত ৩০ বছরে ৫০টিরও বেশি দেশে সম্মিলিতভাবে ২০০টিরও বেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে তারা।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ৮ থেকে ১১ অক্টোবর বাংলাদেশে যৌথভাবে একটি প্রাক-নির্বাচন মূল্যায়ন (পিইএএম) প্রতিনিধিদল পাঠায় এনডিআই ও আইআরআই। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনের সময় আরেকটি কারিগরি মূল্যায়ন মিশন (টিএএম) পাঠায় তারা। ওই মিশনের পাঁচজন সদস্য বাংলাদেশে অবস্থানকালে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী, রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ২০ ডিসেম্বর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই মিশনের পর্যবেক্ষণের আলোকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

এনডিআই-আইআরআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় অতীতের তুলনায় প্রত্যক্ষ ও অনলাইন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে কম। এটি হয়েছে প্রধানত দেশব্যাপী দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুপস্থিতি এবং নিরাপত্তায় সরকার বাড়তি নজর দেওয়ায়।’

নির্বাচনের ‘গুণগত মান ক্ষুন্ন হওয়ার’ পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জানুয়ারির নির্বাচনের গুণগত মান ক্ষুন্ন হয়েছে যেসব ঘটনার কারণে তা হলো রাষ্ট্র, শাসক দল ও বিরোধীদের সহিংসতা। সেই সঙ্গে নির্বাচনের আগের পরিবেশ তথা রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সহিংসতা, নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন এবং বাকস্বাধীনতা ও সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতার অবনতির মতো বিষয়গুলো রয়েছে।’

এনডিআই-আইআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অনেক অংশীজন অভিযোগ করেছেন যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সুবিধা দিতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষেবা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বারবার অসমভাবে নির্বাচনী বিধি প্রয়োগ করেছে। বিরোধী দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত বা ব্যাহত করার জন্য সরকারের প্রচেষ্টা সন্তোষজনক ও ন্যায়সংগত ছিল না এবং এর ফলে নির্বাচনকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সম্পর্কে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়েছিল।’

অ-রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিদের দ্বারা নির্বাচনী সহিংসতা দুভাবে ঘটেছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, যার প্রথম রূপটি ছিল প্রার্থী এবং সমর্থকদের প্রতিযোগিতার মধ্যে।

নির্বাচনী এলাকায় সহিংসতা সাধারণত আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ছিল উল্লেখ করে বলা হয়, ‘যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাবেক প্রার্থীদেরও টার্গেট করা হয়েছে।’

সহিংস ঘটনা হিসেবে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, প্রচার মিছিলে হামলা, প্রচার কার্যালয় ধ্বংস বা অগ্নিসংযোগ, মৌখিক হুমকি এবং ভাঙচুর বা সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয় এনডিআর-আরআইআরের প্রতিবেদনে। এতে নির্বাচনবিরোধীদের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহিংসতার দ্বিতীয় রূপটি চালিত হয়েছিল বিরোধীদের বয়কট প্রচেষ্টার দ্বারা। এরপরও অগ্নিসংযোগ, শারীরিক হামলা, ভাঙচুর, ভীতি প্রদর্শনসহ মাঝে মাঝে সহিংসতা হয়েছে এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।’

বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক করতে হলে সবপক্ষকে অহিংস রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করেছে মার্কিন এ দুই প্রতিষ্ঠান। আইআরআইয়ের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক জোহানা কাও বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা নাগরিকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি প্রধান প্রতিবন্ধক। বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক করতে হলে সবপক্ষকে অহিংস রাজনীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে।

এনডিআইয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক মনপ্রীত সিং আনন্দ বলেন, এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতে আরও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য একটি মূল্যবান রোডম্যাপ হিসেবে অবদান রাখবে। অহিংস রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল, সরকার, নাগরিক সমাজসহ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডল জুড়ে নেতাদের নির্বাচনী রাজনীতির নিয়ম, অনুশীলন ও নিয়মগুলোর সংস্কার করার প্রয়োজন রয়েছে।

এ প্রতিবেদনের বিষয়ে গতকাল রবিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এনডিআই ও আইআরআই যে রিপোর্ট দিয়েছে, সেখানে তারা স্বীকার করেছে, অন্যান্য সময়ে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনের তুলনায় এবার কম সহিংসতা হয়েছে। আর মানের কথা বলছে, বাংলাদেশে যেসব নির্বাচন ইতিপূর্বে হয়েছে বা আমাদের উপমহাদেশে যে নির্বাচন হয়, সেই তুলনায় এ নির্বাচনের মান অনেক উন্নত ছিল। একটি সুন্দর ও ভালো নির্বাচন হয়েছে।’

রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এনডিআই ও আইআরআই কী বলল না বলল, এতে কিছু আসে যায় না। তারা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। আমরা সেটা দেখছি। কিন্তু দেশে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। সেখানে বিএনপিসহ তার মিত্ররা অংশগ্রহণ করেনি। বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা শুধু নির্বাচন বর্জন নয়, নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে। সুতরাং তাদের রিপোর্টে যদি এ বিষয়টা বা যারা এ নিয়ে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশে তাদের এ বিষয়টাও অ্যাড্রেস করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি যে নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে এবং শুধু প্রতিহত নয়, নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য সহিংসতা করেছে, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে সে বিষয়গুলোও তো আসতে হবে।’

সরকার প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণ করার বিষয় নয়। তারা প্রতিবেদন দিয়েছে, আমরা প্রতিবেদনটা দেখছি এবং আমরা আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র বা অন্য কেউ যেসব পর্যবেক্ষণ দিচ্ছে, সেগুলো আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত