দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের আবাস রাজধানী ঢাকায়। যে সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে পানির চাহিদা। আর ঢাকা ওয়াসা সেই চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানিই বেশি কাজে লাগাচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর এই নির্ভরতা ৩০ ভাগে নামিয়ে আনতে না পারলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা।
পরিস্থিতি যখন এমন, এরই মধ্যে অন্যান্য বছরের মতো আজ শুক্রবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘শান্তির জন্য পানি’, যা বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে।
বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘পানির প্রতিটি ফোঁটার সর্বোত্তম ব্যবহারই নিশ্চিত করতে পারে পানির সর্বজনীন ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা।’
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় বেশি পানি উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। অন্যান্য সময় বা শীতকালে রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা থাকে ২১০ কোটি লিটার থেকে কখনো কখনো ২৩০-২৪০ কোটি লিটার। কিন্তু গরমকাল এলে এটা বেড়ে ২৬০ কোটি লিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার প্রতিদিন প্রায় ২৯০ কোটি লিটার পানির উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন এখন গড়ে ২৬০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগার রয়েছে পাঁচটি। তবে সংস্থাটি পানি পাচ্ছে চারটি শোধনাগার থেকে। উপরিতলের পানির উৎপাদন ৭০ শতাংশে উন্নীত করার কথা থাকলেও সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা। বর্তমানে উপরিতলের পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। আর বাকি ৬৫ শতাংশ ওয়াসার সরবরাহ করা পানি তারা পাচ্ছে ভূগর্ভস্থ থেকে।
অন্যদিকে ঢাকার চারপাশের নদীর পানি দূষিত হওয়ার অজুহাতে ঢাকা মহানগরীতে বাড়ছে গভীর নলকূপের সংখ্যা। এক জরিপে দেখা যায়, ১৯৭০ সালে ৪৯টি গভীর নলকূপ ছিল। সেখানে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষিত পানি ব্যবহারের অনপুযোগী হয়ে পড়ায় ওয়াসা সুপেয় পানির চাহিদার শতকরা ৭৮ ভাগ ৯০০টিরও বেশি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করছে। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ৪০০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে ২ হাজার ৫০০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।
কয়েক দশক আগেই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং গবেষকরা। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটার বা ৮২.০২ ফুটে, যা ২০০৫ সালে নিচে নেমে হয় ৪৫ মিটার বা ১৪৭.৬৩৬ ফুটে, ২০১০ সালে ৬০ মিটার বা ১৯৬.৮৪৮ ফুটে এবং ২০২৩ সালে এসে তা ৭৫ মিটার বা ২৪৬.০৬ ফুটে নেমেছে। আর ২০৫০ সালের মধ্যে এ স্তর নেমে যেতে পারে ১২০ মিটার বা ৩৯৩.৬৯৬ ফুটে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে, তা না হলে চরম বিপর্যয় দেখা দেবে। এ থেকে রক্ষা পেতে ভূগর্ভের পানির ব্যবহার কমানো, ভূগর্ভে পানির প্রবেশ বাড়ানো এবং জলাধার ও জলাশয়ের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সরবরাহ বাড়াতে প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধরে রাখার লাগসই প্রযুক্তিগুলোর উন্নয়নে জোর দিতে হবে।
এ বিষয়ে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ‘ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। প্রথম যে সংকট তৈরি হবে সেটা হলো আমরা শিগগিরই চরম পানি সংকটে পড়ব। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সুপেয় পানির সংকট শুরু হয়েছে। এ ছাড়া পানি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ভূগর্ভের পানি এভাবে নিচে নামতে থাকলে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।’
