জিম্মি নাবিক উদ্ধারে ‘মনস্তাত্ত্বিক লড়াই’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৪, ০৩:১০ এএম

সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে জিম্মি ২৩ নাবিক ও এমভি আবদুল্লাহ নামের বাংলাদেশি জাহাজ উদ্ধারে চলছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। আর এ লড়াই তখনই শুরু হলো যখন জলদস্যুদের কাছ থেকে মালিকপক্ষের সঙ্গে ফোন এলো। গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ফোনকল আসার পর এখন পর্যন্ত আর কোনো ফোনকল মালিকপক্ষের কাছে আসেনি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের টহল জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর কাছাকাছি অবস্থান করায় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়েছে। আর এ লড়াই জিম্মি উদ্ধারে দর কষাকষিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন মেরিটাইম খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, এ প্রভাব ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে নেতিবাচক প্রভাবের কোনো কারণ নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনী কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো জাহাজ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের কারণে উপকূল থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে থাকতে হবে। তারা কোনোভাবেই উপকূলের কাছে যেতে পারবে না। আর সোমালিয়ান জলদস্যুরা এমভি আবদুল্লাহকে একেবারে তাদের ঘাঁটি এলাকায় নিয়ে গেছে। গ্যারাকাদ উপকূলে আরও উত্তর দিকে সরে ৪ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে রয়েছে তারা। তাদের সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ যাতে আন্তর্জাতিক বাহিনী আক্রমণ করতে না পারে। আন্তর্জাতিক বাহিনীকে অভিযান চালাতে হলে সোমালিয়া সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিতে হবে।’

তিনি বলেন, এর আগেও যেসব জাহাজ জিম্মি করা হয়েছে, সেগুলোও উপকূলের কাছাকাছি রাখা হয়েছিল একই কারণে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘দস্যুরা এখন তাদের ঘাঁটিতে অবস্থান করায় অনেক শক্তিশালী। আর স্থলভাগ থেকেও সাপোর্ট পাবে তারা। সব মিলিয়ে জলদস্যুরা কৌশলগতভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে এটা ঠিক, ইইউ নেভির এমন নজরদারি জলদস্যুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।’

অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মাকসুদ আলম বলেন, ‘বাংলাদেশি পতাকাবাহী কোনো জাহাজে অভিযান চালাতে হলে অবশ্যই আমাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী অনুমোদনহীনভাবে অভিযান চালানো যাবে না। আর আমরা সেই অনুমোদন দিইনি।’ তিনি আরও বলেন, তারপরও যদি কেউ উসকানিমূলকভাবে কার্যক্রম করে থাকে তাহলে জলদস্যুরা ক্ষিপ্ত হয়ে নাবিকদের ক্ষতি করতে পারে। আমরা আশা করব ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ভারতীয় নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কার্যক্রম করবেন।

এভাবে আন্তর্জাতিক বাহিনীর জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর কাছাকাছি টহল দিলে জিম্মি উদ্ধার আলোচনায় কোন ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘এটা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। একদিকে আলোচনার দ্বার উন্মোচন হলো, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাহিনীর টহল জাহাজ কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতে জলদস্যুরা মানসিকভাবে দুর্বল হতে পারে। এ ছাড়া দর-কষাকষির ক্ষেত্রে তাদের ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করাও হতে পারে এমন টহলের লক্ষ্য।’

তবে জাহাজের মালিকপক্ষ কেএসআরএমের মুখপাত্র মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই সশস্ত্র অভিযান চালাতে নিষেধ করে আসছি। বাংলাদেশ সরকারও কাউকে অভিযান চালাতে সম্মতি দেয়নি। আর সম্মতি ছাড়া আমাদের জাহাজে কেউ অভিযান চালাতে পারবে না।’

আন্তর্জাতিক বাহিনীর নজরদারি আপনাদের আলোচনায় কোনো প্রভাব বিস্তার করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দস্যুদের কাছ থেকে বুধবারের পর থেকে কোনো ফোন আসেনি। তাই এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

মেরিটাইম খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারত মহাসাগর হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম। এই সমুদ্র পথ দিয়ে বিশ্বের অর্ধেক কনটেইনারবাহী জাহাজ, তিন ভাগের এক ভাগ কার্গো জাহাজ ও তিন ভাগের দুভাগ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে থাকে। বাণিজ্যিক দিক থেকে এ অঞ্চল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণের কারণে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের সমুদ্র পথের গুরুত্বও বেড়েছে বহুলাংশে। এখন এ অঞ্চলের জাহাজগুলোর নিরাপত্তা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের টাস্কফোর্সের পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনীও রয়েছে।

গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে জিম্মি করা হয় কেএসআরএম গ্রুপের মালিকানাধীন জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। জাহাজে ২৩ জন নাবিক রয়েছেন। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যারাকাদে নোঙর করে। গত শুক্রবার বিকেলে সেই পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে আরও সাড়ে সাত কিলোমিটার সরিয়ে নেওয়া হয় জাহাজটি। এরপর গত সোমবার আবারও সরিয়ে উপকূলের কাছাকাছি নেওয়া হয়। একই গ্রুপের জলদস্যুরা কেএসআরএমের মালিকানাধীন জাহাজ এমভি জাহান মনি ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল বলে মনে করছেন মেরিটাইম খাতের বিশেষজ্ঞরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে জিম্মি জাহাজ ও ২৫ নাবিকসহ ২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। সোমালিয়ান জলদস্যুরা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটটি জাহাজ জিম্মি করেছিল। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জিম্মি করেছিল ৩৫৮টি জাহাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত