কারাবাসের বিকল্প ক্ষতিপূরণ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৪, ১১:৫২ এএম

ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মতি মাতবর নামে এক ব্যক্তিকে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পাঁচ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। অধস্তন আদালতে আপিল খারিজের পর হাইকোর্টে করা হয় রিভিশন আবেদন। মামলার পর থেকে ২০ মাস কারাগারে ছিলেন মতি। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে তাকে বাকি কারাবাসের পরিবর্তে প্রবেশনে (কারাবাস না দিয়ে মুক্ত পরিবেশে শর্ত সাপেক্ষে সংশোধনের সুযোগ) পাঠানোর আদেশ দেয়। এ জন্য বৃদ্ধা মায়ের সেবাযত্ন করা, স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ও ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া, তাদের বাল্যবিয়ে না দেওয়ার শর্ত দেয় হাইকোর্ট।

তিন বছরের বেশি সময় পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শরীয়তপুরের জাজিরার বিলাশপুর ইউনিয়নের আলীমুদ্দি মাতবরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মতি মাদবর সব শর্ত পালন করেছেন। ইতিমধ্যে তার প্রবেশন (সাজার মেয়াদ) শেষ হয়েছে। অর্থদন্ড থেকেও রেহাই মিলেছে তার। মতি এখন ঢাকার পোস্তগোলায় লোহার ব্যবসা করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা ভুলে আমার জীবনটা ধ্বংসের পথে গিয়েছিল। আইন মানুষকে শাস্তি দেয়। আবার আইনই আমাকে রক্ষা করেছে। আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়েছে। আমি পরিবার নিয়ে এখন ভালো আছি।’

আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা প্রায় ২৫ লাখের মতো। এর মধ্যে শুধু অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা প্রায় ২২ লাখ। যার বড় অংশ লঘু অপরাধজনিত। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইনগুলোর লক্ষ্য কেবলই সাজা ও কারাবাস। আসামির সংশোধন ও পুনর্বাসনের দিকনির্দেশনা নেই আইনগুলোতে। দেশের আইনি কাঠামো ব্যবস্থাও এমন যে চুরি, মারামারি, ছিনতাই, স্বল্প পরিমাণ মাদক, উৎপাত, হুমকি, মানহানিএ রকম মামলায়ও আসামিপক্ষকে বছরের পর বছর হাজিরা দিয়ে আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। তেমনি বিড়ম্বনার শেষ নেই বাদীপক্ষেরও। অন্যদিকে আসামি প্রথমবারের মতো আইনের আওতায় এসেছে কি না, তার সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান, দারিদ্র্য, আবেগ এবং কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অপরাধটি হয়েছে কি না, সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, এসব বিষয় আমলে নেওয়া হয় কমই।

আইনজীবীরা বলেন, দেশে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলায় আপস, শর্ত বা ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। তবে, লঘু অপরাধে আইনের আওতায় আসা ব্যক্তিকে কারাবাসের বাইরেও সংশোধন, আত্মোপলব্ধি, পুনর্বাসন ও পুনরায় বেআইনি আচরণ রোধে ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে ক্ষতিপূরণ, অর্থদন্ড ও প্রবেশন হতে পারে উত্তম ব্যবস্থা।

আদর্শ হতে পারে ‘অপরাধী প্রবেশন অধ্যাদেশ’ : বাংলাদেশে ‘দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০’ বা অপরাধী প্রবেশন অধ্যাদেশ রয়েছে।

এই অধ্যাদেশে লঘু অপরাধের অভিযোগে আসামিকে কারাগারে না পাঠিয়ে পারিবারিক কিংবা মুক্ত পরিবেশে শর্ত দিয়ে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে, কেবল আগে দন্ডিত হননি এমন ব্যক্তিরাই এই সুবিধা পাবেন এবং তা ফাঁসি বা যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে এমন মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আইনের ৬ ধারামতে, আদালতের বিবেচনা ও যুক্তিসংগত কারণ অনুযায়ী, আসামি কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণসহ মামলার সমুদয় খরচের আদেশ দিতে পারেন সংশ্লিষ্ট বিচারক। তবে ক্ষতিপূরণ বা মামলার খরচসংক্রান্ত এই চর্চা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইনের বিধান অনুযায়ী, ফৌজদারি কোনো লঘু অপরাধে কারও সাজা হলে আদালত এ ক্ষেত্রে দেখবে আসামির সামাজিক ও পারিবারিক ইতিহাস, বয়স, দৈহিক ও মানসিক অবস্থা, আগের ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড আছে কি না। আইনে প্রবেশনে থাকাকালে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সদাচরণকে। তবে আইনে সদাচরণের নির্দিষ্ট কোনো কিছু উল্লেখ না থাকলেও আদালত ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, বই পড়া, বাবা-মায়ের সেবাযত্ন, হাসপাতালে রোগীর যত্ন, গাছের চারা রোপণ, ধর্মীয় উপাসনা, ফুলের বাগান পরিচর্যা, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মতো শর্ত ও নির্দেশনা দেন। প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট এলাকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তার নজরদারি ও তদারকিতে থাকেন। কর্মকর্তারা ব্যক্তির গতিবিধি, আচরণ ও আদালতের শর্ত পালন নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা কারণেই ভুল মানুষ করে। গুরুতর বা পেশাগত অপরাধী বাদে অন্যদের ছোট ভুল শোধরানোর সুযোগ কিন্তু করে দেওয়া উচিত। শুধু কারাগারে পাঠিয়ে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করার সেকেলে মানসিকতা এখন আর চলে না। পৃথিবীর অনেক দেশই এ বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে শুধু সাজা দিয়ে সুস্থ, সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা দুরূহ।’   

১৬ মাসে সংশোধনের সুযোগ পেয়েছেন ৭৪৭৪ জন : সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় সংশ্লিষ্ট আদালতের মঞ্জুর করা প্রবেশনারের সংখ্যা ৫ হাজার ৬৯৫। এ ছাড়া গত বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৭৯ জন প্রবেশনারসহ ১৬ মাসে মোট প্রবেশনে পাঠানো হয়েছে ৭ হাজার ৪৭৪ জনকে। অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, লোকবলের অভাবে তদারকিতে একটু ঘাটতি থাকলেও প্রবেশনের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রবেশন) মোসাম্মাৎ উম্মুল আরা ফেরদৌসি বলেন, ‘যাদের প্রবেশন দেওয়া হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই সমাজের মূলধারায় ফিরে আসছেন।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপে কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ নিয়ে সমাজের মূলধারায় এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তদারকির কিছু ঘাটতি আছে। এ ক্ষেত্রে লোকবলের ঘাটতি একটা কারণ। যথাযথ তদারকি এবং সপ্তাহে দুয়েক দিন শুধু প্রবেশনারদের জন্য আদালত নির্ধারণ করা গেলে এর সুফল আরও বাড়বে।’   

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা মতি মাতবরকে আইনি সহযোগিতা দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় আবেগ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বুঝতে না পারা, সন্তানের ভরণপোষণ ও পরিবেশের কারণেও ভুল হয়। প্রশ্ন হলো, এই অপরাধের দায় কি আমৃত্যু বহন করে যেতে হবে? এ জন্য প্রবেশন, অর্থদন্ডের মতো বিকল্প পন্থাগুলোর চর্চা বাড়ানো উচিত।’ 

বিচারের বিলম্বে বিকল্প : ২০০৭ সালের ১১ মার্চ রাজধানীর আদাবর থানাধীন নবোদয় হাউজিং সোসাইটি এলাকায় পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাশিকালে পাঁচজনকে মদ্যপ ও উচ্ছৃঙ্খল অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ১৪ মার্চ আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ২২ (ঘ) ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। প্রায় ৮ বছর পর ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি ঢাকার একটি আদালত আসামিদের এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড, এক হাজার টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ১০ দিনের কারাদন্ডাদেশ দেয়। আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গত বছরের অক্টোবরে এক আসামি সেন্টু ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ আত্মসমর্পণ করে আপিলের শর্তে জামিন চান। ১৫ বছরের বেশি সময় বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় পড়া এই মামলা নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ নেন বিচারক। আসামিকে সদাচরণ ও ২০টি গাছের চারা রোপণের শর্তে প্রবেশনে পাঠানো হয়। গত বছরের ২১ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও প্রবেশন কর্মকর্তারা সেন্টুর শর্ত পূরণের প্রতিবেদন দাখিলের পর আপিল নিষ্পত্তি করে আদালত তাকে খালাস দেয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছোটখাটো মামলায় বিকল্প এই পদ্ধতির প্রয়োগ বাড়াতে হবে। কেননা, কেউ হয়তো ভুলে একটা অপরাধ করে ফেলেছে, জেলে গেলে তো অনেক সময় ভালোর চেয়ে খারাপ এবং হিতে বিপরীত হয়। বড় অপরাধীদের সঙ্গে মিশে তারাও অপরাধ শেখে। তাদের যে ভালো মন, সেটাও নষ্ট হয়। সংশোধনের সুযোগ পেলে তারা মূলধারায় ফিরে আসবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইন যেগুলো আছে, সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে।’

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কিছু অপরাধ আছে, যেগুলোতে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়। আবার এমন কিছু বিষয় আছে, যেখানে ২০০-৫০০ টাকা জরিমানা কোনো কাজে আসবে না। কিছু ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিলে আর জীবনেও এসব করবে না। মূল কথা হলো, দেখতে হবে যে কোনটায় জরিমানা পর্যাপ্ত হবে। যে অপরাধের জন্য পর্যাপ্ত হবে, সে ক্ষেত্রে এটা করা যেতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত