মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেওয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে কোরআন মজিদ। কোরআন হচ্ছে পরশপাথর। এর কারণে আল্লাহতায়ালা রমজান মাসের মর্যাদা দান করেছেন। যে রাতে এই কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, সেই রাতটিও হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তির ওপর এই কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। ইরশাদ হয়েছে, ‘রমজান মাসই হলো সেই মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে মানুষের পথের দিশারি, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী আল কোরআন। অতএব তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস প্রত্যক্ষ করবে তারা এতে রোজা পালন করবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)
এমনিভাবে সুরা কদরের প্রথম আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কোরআনকে অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে।’ রোজা পালনের এই বিধান নাজিল হওয়ার প্রায় ১৪ বছর আগে ৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমজান রাতে মক্কা মোকাররমার কাবা শরিফ থেকে তিন মাইল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত গারে হেরায় অবস্থানরত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে কোরআন নাজিলের সূচনা হয়। সর্বপ্রথম যে পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়, তাতে রয়েছে পাঠ করার তাকিদ, সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার পরিচয়, মানব সৃষ্টি, লেখাপড়া, বিদ্যা অর্জন প্রভৃতি বিষয়।
কোরআন শব্দটি দুটি শব্দ ‘কারনুন’ ও ‘কারউন’ থেকে এসেছে। ‘কারনুন’ অর্থ মেলানো। আর ‘কারউন’ অর্থ পঠিত কিতাব। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কোরআন মজিদ সব কিতাবের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত কিতাব। তা ছাড়া এর মধ্যে সুরা, আয়াত এবং অক্ষরগুলো মেলানো হয়েছে। পরিভাষায়, কোরআন আল্লাহর নাজিলকৃত ওই কিতাবকে বলা হয়, যা তিনি তার শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরব্যাপী বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, প্রয়োজন মোতাবেক অল্প অল্প করে অবতীর্ণ করেছিলেন। ভাষা ও ভাব উভয় দিক থেকেই কোরআন আল্লাহর কিতাব। অর্থাৎ কোরআনের ভাব (অর্থ) যেমন আল্লাহর তরফ থেকে আগত তেমনি তার ভাষাও।
মাহে রমজানের আমলগুলোর অন্যতম একটি আমল হলো, কোরআন মজিদ তিলাওয়াত। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেওয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে, এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দান করবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’ (সুরা ফাতির : ২৯-৩০)
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল কোরআনে দক্ষ ও জ্ঞানী ব্যক্তি সম্মানিত পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। যে ব্যক্তি কোরআন আটকে আটকে তিলাওয়াত করে এবং তা তার জন্য কষ্টকর হয়, তার জন্য দুটি প্রতিদান রয়েছে। প্রথমটি, তিলাওয়াতের প্রতিদান, দ্বিতীয়টি কষ্টের প্রতিদান।’ (সহিহ বোখারি)
হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুমিন কোরআন তিলাওয়াত করেন, তার দৃষ্টান্ত কমলালেবুর মতো, যা সুস্বাদু ও সুঘ্রাণযুক্ত। আর যে মুমিন তিলাওয়াত করে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুরের মতো, যার ঘ্রাণ নেই, কিন্তু মিষ্টি।’ (সহিহ মুসলিম)
বিদায় হজের ভাষণে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব ও তার রাসুলের সুন্নত, তোমরা যদি তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, তাহলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না।’ (সহিহ বোখারি)
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা
