কমেছে আয়ু বেড়েছে শিশুমৃত্যু

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ১১:২২ এএম

দুই বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যে কারণে পুষ্টিকর খাবারও নিশ্চিত করতে পারছে না। ওষুধের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় চিকিৎসাসেবায় থাকছে ঘাটতি। এমন পরিস্থিতি দেশের মানুষের গড় আয়ু কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে, বেড়েছে শিশুমৃত্যুর হার।

শুধু জীবন-মৃত্যুর হারই নয়, অন্য অধিকাংশ সূচকেই নেতিবাচক ধারায় বাংলাদেশ; বিশেষ করে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়া, প্রজনন হার কমে যাওয়া, শিশুমৃত্যু বেড়ে যাওয়াসহ অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিটিসটিকস ২০২৩ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন, পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু প্রমুখ।

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারীর সময়ে মানুষ যেসব মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের শিকার হয়েছিল, সেগুলোর প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে। এই প্রভাবের ফল আরও কয়েক বছর থাকতে পারে। ওই সময়ে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার ফলে এখন সামাজিক চাপ বেড়েছে; বিশেষ করে ওই সময়ে যাদের বাল্যবিয়ে হয়েছিল, তাদের বান্ধবীদের এখন সামাজিক চাপে পড়ে বাল্যবিয়ে মেনে হতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক। মেয়েদের বিয়ের বয়স কমিয়ে দেওয়ার ঘটনায় মানুষ বাল্যবিয়েতে আরও বেশি উৎসাহিত হয়েছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় তাদের প্রজননশীলতা কিছুটা কমেছে।

প্রত্যাশিত গড় আয়ু কিছুটা কমেছে : প্রত্যাশিত গড় আয়ু বলতে বোঝায়, আজ যে শিশু জন্ম নিয়েছে, তার বাঁচার সম্ভাবনা কত বছর। ২০২৩ সাল শেষে প্রত্যাশিত আয়ু কমে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। বিপরীতে এ সময়ে দেশে স্থূল মৃত্যুহার বেড়ে প্রতি হাজারে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিটি দশকেই এ হার বেড়েছে। এর মধ্যে কেবল ষাটের দশকের মাঝামাঝি, অর্থাৎ ১৯৬৫ সাল নাগাদ যে বৃদ্ধি ঘটেছে, দশক শেষে মানে ১৯৭০ সালে এসে তার কিছুটা অবনতি হয়েছে। পরবর্তী প্রায় সব দশকে, একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া, পাঁচ বছর করে বেড়েছে দেশের মানুষের গড় আয়ু। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে গড় আয়ু বেড়েছে সাত বছর। যদিও ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত গড় আয়ু বৃদ্ধি কিছুটা স্থবির হয়ে আছে।

গড় আয়ু কিছুটা কমার ব্যাখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গড় আয়ু বা প্রজনন হার কমে যাওয়া এগুলো সবই করোনার প্রভাব। করোনার সময় যে আতঙ্কগুলো ছিল সন্তান নেব কি নেব না, হাসপাতাল পাব কি পাব না এসব থেকে মানুষ কিছুটা বের হয়ে আসছে বলে বোঝা যাচ্ছে। যারা করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন, স্বজন হারিয়েছিলেন, সেই প্রভাব এখন গড় আয়ুতে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি করোনাজনিত কারণে যেসব রোগবালাই আমাদের শরীরে বাসা বেঁধেছে, সেগুলোরই প্রভাব প্রত্যাশিত গড় আয়ুতে পড়েছে; বিশেষ করে আরও এক-দুই বছর পর করোনার প্রভাব আমরা দেখে বলতে পারব এসব কেন হচ্ছে। করোনার সময় ভয়ভীতিতে অনেকে সন্তান নেননি। আবার করোনার সময় যাদের বিয়ে হয়েছিল, তাদের সন্তান এখন হচ্ছে।’

আশঙ্কা বাড়িয়েছে শিশুমৃত্যু : স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশে এক বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ছিল ১৪১ জন, সেটা থেকে উন্নতির ধারাবাহিকতার সর্বোচ্চ শিখরে বাংলাদেশ পৌঁছেছিল ২০২০ সালে, তখন হাজারে মৃত্যু ছিল ২১ জন। সেই সাফল্য ম্লান হতে শুরু করেছে ২০২১ সালের পর থেকে। ওই বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে ২০২৩ সাল শেষে শিশুমৃত্যু বেড়ে হাজারে এখন ২৭ জনে ঠেকেছে। শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়াটা স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে। তবে এই পরিবর্তন শুধু গ্রামেই বেশি। গত এক বছরে গ্রামে এই বয়সী শিশুমৃত্যু ছিল হাজারে ২৮, যেটি এক বছর আগেও ছিল ২৪ জন। শহরের ক্ষেত্রে গত বছরের মতোই ২৪ জনে স্থির রয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন,  শিশু জন্মের সময় পর্যাপ্ত সুবিধা পেয়েছে কি না, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাভাবিক প্রসব বাড়লেও সে যদি উন্নত সেবা না পায়, সেখানে যদি বেশি রক্তপাত হয়, তাহলে তো সেটা নেতিবাচক। প্রসব কোথায় হলো, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

তিনি বলেন, জন্মের পর শিশু নিবিড় পরিচর্যা ঠিকমতো পেয়েছে কি না, সেটাও দেখতে হবে। বাচ্চা হওয়ার পরে সেখানে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। সে সময় যদি সে যথাযথ সেবা না পায়, তখন একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ল : ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার, বাল্যবিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। কিন্তু শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন নেতিবাচক ধারাকে আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এসডিজিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে শিশুমৃত্যু হাজারে ১২ জনে নামিয়ে আনা। এখন আছে ২৭। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। মূলত পাঁচটি কারণে নবজাতকের মৃত্যু হয়। প্রধান কারণ হলো শ্বাসকষ্ট। এ ছাড়া কম ওজন, নাভিতে সংক্রমণ এবং জন্মগত কিছু ত্রুটি এগুলোও মৃত্যুর প্রধান কারণ।

মঈনুল ইসলাম বলেন, এতে সরকার আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। এখন ২০২৪ সাল, ২০৩০ সালের মধ্যে এসব লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে পূরণ হবে? সরকারের তৃণমূল পর্যায়ে এগুলোর কাজ ঠিকভাবে হচ্ছে না।

কমেছে নারীর প্রজনন হার : প্রজনন হার বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী একজন নারী কতজন সন্তান জন্ম দিতে পারেন। ২০২২ সালে নারীদের প্রজনন হার কিছুটা বেড়ে ২ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সাল শেষে তা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

নারীদের প্রজনন হার কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শেখ ইমতিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের কর্মজীবী নারীর হার বেড়েছে। যে কারণে নারীরা দেরিতে বিয়ে করছেন। সেই প্রভাব পড়েছে প্রজননশীলতায়।

দেশে বাল্যবিয়ে বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে : এক বছরের ব্যবধানে দেশে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে। বাল্যবিয়ে বাড়লেও নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কিছুটা কমেছে।

জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে বিয়ের হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালেও এ হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ের হারও বেড়েছে। গত বছর দেশে এই বয়সী নারীদের বিয়ের হার ছিল ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ, অন্যদিকে ২০২২ সালেও এ হার ছিল ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ।

দেশে হঠাৎ করে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার ব্যাখ্যায় অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর স্কুল প্রায় বন্ধ ছিল, স্কুল থেকেই অনেক শিক্ষার্থীর মন উঠে গেছে। হয়তো তার নাম আছে স্কুলের খাতায়। ওই সময় যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তাদের বান্ধবীর বাবা-মায়েরা এখন সামাজিক চাপে পড়েছেন। ফলে বাবা-মায়েরা তাদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন। টানা দুই বছর পড়াশোনার গ্যাপের কারণেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

জরিপের তথ্য বলছে, কখনো বিয়ে হয়নি বর্তমানে দেশে এমন নাগরিক রয়েছে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে পুরুষের আধিক্যই বেশি। ২০২৩ সাল পর্যন্ত কখনোই বিয়ে হয়নি এমন পুরুষের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে নারীর হার ২১ দশমিক ৭ শতাংশ।

ড. মঈনুল ইসলাম মনে করেন, বাল্যবিয়ে ঠেকানোর জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। তৃণমূল পর্যায়ে বাল্যবিয়ে নিরোধ যে কমিটি আছে, সেগুলো কাজ করছে না। ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা, সেটি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

এ ছাড়া দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন দম্পতিরা। বর্তমানে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২২ সালেও যা ছিল ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু বলেন, দেশের নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ অনেক নারী কর্মজীবী, বিশেষ করে শিক্ষিত নারীরা। তাদের কর্মের কারণে তারা স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকেন। দেশের শিক্ষিত নারীদের দেরিতে বিয়ের প্রবণতাও বেড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত