দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও ইসলামি মূল্যবোধ

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪, ১০:৫১ এএম

পৃথিবীতে যত নবী-রাসুল আগমন করেছেন তারা সবাই সমাজ, জাতি ও দেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। কেননা মহান আল্লাহ সবাইকে স্বাধীন হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি পরাধীনতাকে পছন্দ করেন না। সবাই যার যার ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, এটাই তার ইচ্ছা। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এটাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মহান আল্লাহ সবাইকে বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা দিয়েছেন। এক্ষেত্রেও কাউকে পরাধীন করেননি। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আপনার প্রভু ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই এক সঙ্গে ইমান নিয়ে আসত। তবে কি আপনি মুমিন হওয়ার জন্য মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ করবেন?’ -(সুরা ইউনুস, আয়াত ৯৯) এই আয়াত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে, মহান আল্লাহ সবার স্বাধীনতা চান। তিনি চাইলে সবাইকে একসঙ্গে মুমিন বানাতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন স্বাধীনভাবে বুঝেশুনে ইমান আনে। স্বাধীনতাকে ইসলাম যেমন গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধকেও অতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যার ফলে দেশপ্রেমকে ইমানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আমরা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত। যার স্পষ্ট নির্দেশ হলো, ‘মুসলমান ভাই ভাই। মুসলমানের রক্ত ও মান-মর্যাদা একে অপরের জন্য আমানতস্বরূপ।’

পাকিস্তানি নেতা ও শাসকবর্গ সেই আমানত রক্ষা করেনি। পাকিস্তানি নেতা ও শাসকদের মুখে ধর্মের বাণী থাকলেও কাজেকর্মে ছিল তারা ভয়ানক বর্বর ও পিশাচ। তারা দীর্ঘ চব্বিশ বছরের শাসনকার্যে বর্বরতায় ব্রিটিশদেরও পেছনে ফেলেছিল। আর সর্বশেষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাঙালি জাতির ওপর চালিয়েছিল বর্বরোচিত গণহত্যা। এতে আমরা হারিয়েছি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। শহীদ হয়েছেন অসংখ্য যোদ্ধা। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এ দেশের মাটি। সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য মা-বোন। তাদের চাপা কান্নায় কম্পিত হয়েছে এ দেশের আকাশ মাটি। দখলদাররা পুড়িয়ে দিয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। তাদের এমন বর্বরোচিত নির্যাতন ও অত্যাচারে এ দেশের আকাশে জড়ো হয়েছিল ঘন কালো মেঘ। অদম্য বীরদের হার না মানা সংগ্রামে দেশের আকাশ থেকে দূর হয় সেই ঘনঘটা মেঘ। আর আমরা অর্জন করি কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

স্বদেশের প্রতি ছিল রাসুল (সা.)-এর গভীর ভালোবাসা। রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনার পথে হিজরতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে জন্মভূমি মক্কার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, যেখানে তিনি নবুয়ত লাভ করেছেন এবং তার পূর্বপুরুষরা বসবাস করে আসছেন। অতঃপর মদিনায় আসার সময়ও তিনি বারবার ফিরে তাকান মক্কার দিকে, তখন তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছিল। মক্কার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘হে মক্কা! তুমি আমার কাছে সমস্ত স্থান থেকে অধিক প্রিয়, আমি তোমাকেই ভালোবাসি। আমার মন মানছে না। কিন্তু তোমার লোকেরা আমাকে এখানে

থাকতে দিল না।’ -(মুসনাদে আহমদ) স্বদেশের প্রতি এমনই গভীর প্রেম ছিল তার। স্বদেশের মানুষ তার ওপর এত জুলুম-অত্যাচার করেছে, তারপরও স্বদেশের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা।

রাসুল (সা.)-এর মতো সাহাবায়ে কেরামও নিজ মাতৃভূমিকে খুব ভালোবাসতেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মহানবী (সা.) যখনই আহ্বান করেছেন তখনই সাহাবায়ে কেরাম তার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তারা জানতেন নিজেদের বিশ্বাস, আদর্শ ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রয়োজন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যেমন আন্তরিক ছিলেন, তেমনি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন দেশপ্রেম ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায়। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি খায়বার অভিযানে খাদেম হিসেবে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় ওহুদ পাহাড় রাসুল (সা.)-এর চোখের সামনে পড়লে তার চেহারায় আনন্দের আভা ফুটে ওঠে। আর তখন তিনি বললেন, এই ওহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও এই পাহাড়কে ভালোবাসি।’ -সহিহ বুখারি

আমরা একটি স্বাধীন দেশের বাসিন্দা। আমাদের প্রত্যেককে হতে হবে আদর্শ নাগরিক। আর একজন আদর্শ নাগরিকের দায়িত্ব হলো তার মাতৃভূমি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসা। এটাই আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর উত্তম আদর্শ। গতকাল ছিল মহান স্বাধীনতা দিবস। আমরা তাদের স্মরণ করছি যাদের আত্মদানের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ। এখন এ দেশকে বিশ্বের মানচিত্রে উন্নত এক দেশ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে আমাদের প্রত্যেককে স্ব-স্ব ভূমিকা পালনে সদা তৎপর থাকতে হবে। আর মহান আল্লাহ আমাদের স্বাধীনতাকে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুন্ন রাখুন, মুক্তির প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের তাওফিক দান করুন এবং স্বাধীনতা অর্জন পরবর্তী করণীয় অনুধাবন ও পালনের সুযোগ দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত