রমজান মাসে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয় প্রত্যেক মুমিনের জন্য। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ।’ -সহিহ মুসলিম
নবী কারিম (সা.) নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। তাহাজ্জুদ অর্থ ক্লেষ-কষ্ট, শ্রম-পরিশ্রম। রাতে ঘুমানোর পর মধ্যরাতে, অর্থাৎ রাতের দুই-তৃতীয়াংশে শয্যাত্যাগ করার নাম তাহাজ্জুদ। সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।
রাতের দুই-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাহাজ্জুদের সময়। সাহরির সময় শেষ হলে তাহাজ্জুদের ওয়াক্তও শেষ হয়ে যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা আজান দেওয়া হতো। এখনো মক্কা ও মদিনায় এ রীতি চালু আছে। তাহাজ্জুদ একাকী পড়া উত্তম। তাই অন্য সব সুন্নত ও নফল নামাজের মতো তাহাজ্জুদের নামাজেও সুরা-কেরাত নিচু স্বরে পড়তে হয় এবং এর জন্য ইকামতের প্রয়োজন হয় না।
স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য ডেকে তোলা সুন্নত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হরজত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই স্ত্রীর প্রতি রহমত করেছেন, যে নিজে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগায়। যদি সে উঠতে অস্বীকার করে, তবে যেন তার মুখম-লে পানির ছিটা দেয়।’ -সুনানে আবু দাউদ
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে নামাজ আদায় করতেন, এমনকি তার পা ফুলে যেত। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এত কষ্ট করেন কেন? অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কী কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? তার মেদ বর্ধিত হলে (অর্থাৎ বার্ধক্যে পৌঁছালে) তিনি বসে নামাজ আদায় করতেন। যখন রুকু করার ইচ্ছে করতেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে কেরাত পড়তেন, তারপর রুকু করতেন। -সহিহ বুখারি : ৪৮৩৭
তাহাজ্জুদের প্রতি নবী কারিম (সা.)-এর তীব্র আকর্ষণের কথা বিবৃত হয়েছে কোরআন মাজিদে। মহান আল্লাহ পরম মমতায় কোরআন মাজিদে বলেছেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত! রাত জাগরণ করো কিছু অংশ ব্যতীত। অর্ধ রাত কিংবা তদপেক্ষা কিছু কম। অথবা তদপেক্ষা বেশি। আর কোরআন আবৃত্তি করো ধীরে ধীরে স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে। আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয়ই রাতে জাগরণ ইবাদতের জন্য গভীর মনোনিবেশ, হৃদয়ঙ্গম এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। দিনে তোমাদের জন্য রয়েছে কর্মব্যস্ততা।’-সুরা মুযযাম্মিল : ১-৭
তাহাজ্জুদের জন্য নবী কারিম (সা.) পরিবারের লোকজন থেকে শুরু করে সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তাহাজ্জুদ দুই দুই করে চার রাকাত, আট রাকাত, বারো রাকাত এভাবে কম বা বেশি পড়া যায়। তাহাজ্জুদ নামাজের রুকু-সেজদা লম্বা করা সুন্নত। রমজান মাসে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। বছরের অন্য মাস বা দিনে রাতে ঘুমানোর পর ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া কষ্টকর হওয়ায় অনেকেই তা পড়তে পারেন না। কিন্তু রমজান মাসে ফরজ রোজা আদায়ের উদ্দেশ্যে সাহরি খাওয়ার জন্য গভীর রাতে উঠতে হয়, সেই সুবাদে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া সহজ হয়ে যায়। রমজান মাসে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়লে একদিকে যেমন অনেক ফজিলত পাওয়া যায়, তেমনি এটি একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। যার ফলে পরবর্তী মাসগুলোতেও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়াটা অনেকাংশে সহজ হয়ে যায়। আর এই মাসে একটি নেক আমল অন্য মাসের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি উত্তম। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মুমিন নর-নারীকে তাহাজ্জুদের ফজিলত লাভে ধন্য করুন। আমিন।
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা।
