ছাত্ররাজনীতি বন্ধে ফের উত্তাল বুয়েট

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ০৪:৩৫ এএম

ছাত্ররাজনীতি ইস্যুতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এবার ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বুয়েট ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের প্রবেশের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা ছাত্ররাজনীতি প্রতিরোধের ঘোষণার পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনায় জড়িতদের বহিষ্কারসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে বুয়েট শহীদ মিনারের পাদদেশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। তার আগে দুপুরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা বুয়েট ক্যাম্পাসে ঢোকেন। পরে সেখানে ছাত্রলীগের আরও অনেক নেতাকর্মী জমায়েত হন। এ ঘটনার পর ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের প্রতিবাদে গতকাল শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সেখান থেকে ছয় দফা দাবি জানান তারা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজনৈতিক সমাগমের মূল সংগঠক পুরকৌশল বিভাগের ইমতিয়াজ রাব্বিকে বুয়েট থেকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং হলের আবাসন বাতিল; ইমতিয়াজ রাব্বির সঙ্গে বুয়েটের বাকি যেসব শিক্ষার্থী জড়িত ছিল তাদের বিভিন্ন মেয়াদে হল এবং টার্ম থেকে বহিষ্কার; বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তি যারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তারা কেন কীভাবে প্রবেশ করার অনুমতি পেল এ ব্যাপারে বুয়েট প্রশাসনের সুস্পষ্ট সদুত্তর ও জবাবদিহি, উল্লিখিত দাবিগুলো আজ শনিবার সকাল ৯টার মধ্যে বাস্তবায়ন করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের পদত্যাগ; ক্যাম্পাসে মধ্যরাতে বহিরাগতদের প্রবেশের কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং এর প্রতিবাদ হিসেবে আজ ও আগামীকালের টার্ম ফাইনালসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না এ মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি।’

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও দপ্তর সম্পাদকসহ কয়েকজন নেতা বুয়েট ক্যাম্পাসে ঢোকেন। তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে সহায়তা করেন বুয়েট শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ রাব্বি। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর বুয়েটে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নতুন করে রাজনীতি শুরুর পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

২০১৯ সালে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয় বুয়েট ক্যাম্পাসে। কিন্তু গত বুধবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের একটি বহর বুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে সমাদৃত এবং শীর্ষস্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবরার ফাহাদের নৃশংস মৃত্যুর মাধ্যমে বুয়েট দেশের সবচেয়ে অনিরাপদ ক্যাম্পাসে রূপ নেয়। সেখানে আবার যদি রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে ফের অনিরাপদ ক্যাম্পাসে পরিণত হবে।

এক দাবি পূরণ, বাকিগুলোর জন্য সময় চাইলেন উপাচার্য : গতকাল সংবাদ সম্মেলনের পর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বুয়েটের ড. এমএ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের বিক্ষোভ চলে। সেখানেই তারা ইফতারি করেন। ইফতারির পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপাচার্য সত্যপ্রসাদ মজুমদার সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় সহ-উপাচার্য আবদুল জব্বার খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) মিজানুর রহমান প্রমুখ তার সঙ্গে ছিলেন।

উপাচার্য শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কথা বলেন। তিনি ইমতিয়াজ রাব্বির হলের সিট বাতিল করার ঘোষণা দেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে ওঠেন। উপাচার্য তখন বলেন, কাউকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বহিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আজই গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দাবি প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, সেটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি আজই করা হবে। চতুর্থ দাবি অনুযায়ী, বুয়েটে প্রবেশ করা বহিরাগতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তারা কারা, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি করা হবে।

এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা আবার চিৎকার করে ওঠেন। তাদের দাবি করেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। উপাচার্য তখন বলেন, ‘এভাবে তো হবে না।’ এ সময় এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক খুলে দিতে বিলম্ব হয়নি, তাহলে ব্যবস্থা নিতে কেন বিলম্ব হবে?’

একপর্যায়ে আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ফটক খুলে দিতে ডিএসডব্লিউর অনুমতি ছিল। এ সময় উপাচার্যের সঙ্গে থাকা ডিএসডব্লিউ মিজানুর রহমান প্রতিবাদ করলে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন।

শিক্ষার্থীরা থামলে উপাচার্য বলেন, ‘অনুমতি ছিল কি ছিল না, সেটা তদন্ত কমিটি দেখবে।’ তখন ডিএসডব্লিউ বলেন, ‘আমি কাউকে এ ধরনের অনুমতি দিইনি। আন্দাজে কথা বললে হবে না। বুয়েট ক্যাফেটেরিয়া বা সেমিনার কক্ষ ব্যবহার করতে ডিএসডব্লিউ কার্যালয়ের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হয়। তোমরা যে ঘটনার কথা বলছ, সেখানে কার্যালয়ের জন্য কেউ আবেদন করেনি, কাউকে অনুমতিও দেওয়া হয়নি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দায়িত্ব ডিএসডব্লিউর নয়।’

তখন উপাচার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, এক নম্বর দাবির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হবে। দুই নম্বর দাবি অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এজন্য উপাচার্য সময় চান এবং শিক্ষার্থীদের আজকের পরীক্ষায় বসতে অনুরোধ জানান। এরপর উপাচার্যসহ পদস্থ শিক্ষকরা চলে যান। পরে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে গতকালের মতো বিক্ষোভ শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। দাবি আদায়ে আজ সকাল ৮টায় আবারও বুয়েট শহীদ মিনারে তারা জড়ো হওয়ার ঘোষণা দেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি ও আন্দোলনের মুখে রাতেই ছাত্রলীগ নেতা ইমতিয়াজ রাব্বির আবাসিক হলের আসন বাতিল করে প্রশাসন। পাশাপাশি সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করার কথা জানানো হয়েছে। গতকাল রাত ১০টার দিকে বুয়েট প্রশাসন নোটিস বোর্ডে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি সাঁটিয়ে দেয়। ইমতিয়াজ রাব্বি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত