সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে অসহায় মানুষ, এতিম ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছেন নাহিদ আহমেদ। তার কাজের মধ্যে রয়েছে খাদ্যসামগ্রী প্রদান, চিকিৎসা সেবা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ইত্যাদি।। চলতি রমজানে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন প্রায় হাজার পরিবারকে, করিয়েছেন ইফতার। তার সম্পর্কে লিখেছেন আশফাক মুহাম্মাদ শাফি
একজন নাহিদ আহমেদ : সাতক্ষীরা সদরের বাশদহা গ্রামে নাহিদ আহমেদের বাড়ি। জন্ম ১৯৯২ সালে। বাবা ইজ্জত আলী ছিলেন সেনাবাহিনীর সৈনিক। আলহাজ মুহাম্মদ আলী দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনার হাতেখড়ি। ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি করেন। বর্তমানে থাকেন ঢাকার নতুনবাজার এলাকায়। কাজ করেন বেসরকারি কোম্পানিতে। অসহায় মানুষ ও পথশিশুদের ভালোবাসেন। তাদের নিয়েই পড়ে থাকেন প্রায় সময়।
শুরুর গল্প : নাহিদ তখন গ্রামের বিদ্যালয়ে ক্লাস সেভেনে পড়েন। একদিন বিদ্যালয়ের মাঠে সকালের পিটি করছিলেন। সে সময় দেখলেন, তৃতীয় শ্রেণির সাব্বিরের খালি পা, পরনের জামা ময়লা ও ছেঁড়া। জানতে পারলেন, সাব্বিরের মা-বাবা কেউ নেই। নানাবাড়ি থাকে, নানারও সামর্থ্য নেই জামা-জুতা কিনে দেওয়ার। নাহিদের মন খারাপ হয়। নাহিদ বলেন, ‘টাকা ম্যানেজ করতে পারছিলাম না। ওর জন্য আরেকজনের জমিতে কাজ নিলাম। তিন দিন কাজ করে জামা-জুতা কিনে দিলাম। তাকে খুশি হতে দেখে আমার হৃদয় ভরে ওঠে। এরপর মানুষের জন্য কাজ শুরু করি।’
২০১৩ সালে ঢাকায় আসেন নাহিদ। পড়াশোনার পাশাপাশি অল্প বেতনে চাকরি নেন। তখন বেতন পেলেই অসহায় মানুষ নিয়ে হোটেলে খেতে যেতেন। কাপড় কিনে দিতেন। পথশিশুদের যত্ন নিতেন। সে সময় অফিসের কাজে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছিলেন। আবদুল্লাহপুরে অপেক্ষা করছিলেন বাসের জন্য। অদূরে দেখলেন, একজন জ্বরাক্রান্ত পথশিশুকে অন্য পথশিশুরা সেবা দিচ্ছে। তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। নাহিদ তাদের ওষুধ ও খাবার কিনে দেন। এরপর সেখানে নিয়মিত যেতেন। তাদের খাবার দিতেন। ঈদে কাপড় কিনে দিতেন।
পথশিশুদের জন্য আমরা : ২০১৪ সালে উত্তর বাড্ডায় থাকতেন নাহিদ। প্রতি শুক্রবার চলে যেতেন কমলাপুরে। সেখানে পথশিশুদের সঙ্গে মিশতেন। গল্পের ছলে অক্ষরজ্ঞান শেখাতেন। এভাবে কয়েক মাস যায়। এর মধ্যে পথশিশুদের জন্য করেন ‘পথশিশুদের জন্য আমরা’ সংগঠন। তাদের জন্য স্কুল করারও পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। স্বপ্ন দেখছেন, একদিন স্কুল ও আবাসন নির্মাণ করবেন।
মুলকান্দি চরে সহায়তা প্রদান : নাহিদ প্রত্যন্ত গ্রামের অবহেলিত মানুষদের নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন, যমুনা নদীর মুলকান্দি চরে দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত অনেক মানুষ রয়েছে। তাদের কাছে তেমন সহযোগিতা পৌঁছায় না। সেখানে যান নাহিদ। যমুনা সেতুর পূর্ব দিক থেকে ট্রলারে করে যেতে হয়েছে তিন ঘণ্টার জলপথ। চারজনের পরিবার এক মাস চলতে পারবে এমন ১৫০ পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন। ইফতারের আয়োজনও সঙ্গে ছিল।
রমজানে অসহায়ের পাশে : রমজান মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এক হাজার পরিবারকে সাহরি ও ইফতারের জন্য খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন। ইফতার করিয়েছেন হাজারো মানুষকে। এছাড়াও সাহরি ও ইফতার করিয়েছেন মাদ্রাসার ছাত্রদের। নাহিদ বললেন, ‘রমজান জুড়ে মানুষের জন্য কাজ করছি। হাজারো মানুষকে রমজানের বাজার করে দিয়েছি (প্রকাশ্যে ও গোপনে)। ইফতার করিয়েছি। ঈদে দেব ঈদসামগ্রী ও নতুন জামা। ইতিমধ্যে কেনাকাটা শুরু করেছি।’
টাঙ্গাঈলে সহায়তা প্রদান : মাদ্রাসার এতিম ছাত্র ও অসহায়দের জন্য মন কাঁদে নাহিদের। তাদের জন্য সবসময় কাজ করেন। তাদের প্রয়োজনের কথা শুনলে ছুটে যান। সহযোগিতার হাত বাড়ান। ঈদের আগেই যাবেন টাঙ্গাইলে। সেখানে এক গ্রামের মসজিদের জন্য সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। গ্রামের মানুষ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মাইকে আজান দেবে। ঈদের নামাজের সময়ও ব্যবহার হবে। আরও একটি মসজিদের জন্য করেছেন নগদ অর্থের ব্যবস্থা। ঈদের পরে দেবেন দোকান ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান।
মানুষের প্রয়োজন ও সহায়তার কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে মানুষ টাকা-পয়সা দেন নাহিদকে। সে টাকায় প্রয়োজনীয় আসবাব কিনে পৌঁছে দেন ভুক্তভোগীর কাছে। সেসব সহায়তা দেওয়ার ছবি স্বচ্ছতার জন্য ফেসবুকে পোস্ট দেন। অনেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা পাঠান। নাহিদ বললেন, ‘মানুষের সেবা করাই আমার কাজ। সব সময় সৎ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করি। আগামীতেও মানুষের সেবায় কাজ করে যেতে চাই। আর যারা আমাকে বিশ্বাস করেন, ভালোবেসে আমার পাশে রয়েছেন তাদের প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা ও দোয়া।’
