শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আমার মাকে তোমরা মাফ করে দিও গো

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫০ এএম

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ তুলে তার স্বজনরা সেখানে ভাঙচুর চালিয়েছেন। উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় ‘লাইফ কেয়ার’ হাসপাতালে রবিবার রাত পৌনে ১২টায় ভাঙচুরের ওই ঘটনা ঘটে বলে শ্রীপুর থানার ওসি আকবর আলী জানান।

নিহত ৩০ বছর বয়সী ইয়াছমিন আক্তার গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়ারচালা পালপাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী মো. আসাদুল্লাহর স্ত্রী। এই দম্পতির ১০ বছর বয়সী এক মেয়েসন্তান আছে। মায়ের মৃত্যুর সময় সে হাসপাতালেই ছিল। ইকরা মনি নামে শিশুটি বারবার চিৎকার করে বলছিল, ‘আমার মাকে তোমরা মাফ করে দিও গো। মাফ করে দেও, আমার মা মইরা গেছে।’ হাসপাতালে শত শত মানুষের ভিড়ে তার এ আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

আসাদুল্লাহ বলেন, তার স্ত্রীর প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে রবিবার দুপুর ১২টার দিকে তাকে লাইফ কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় চিকিৎসকরা ইয়াছমিনের সিজার করানোর কথা বলেন। পরে ১৪ হাজার টাকায় তারা সিজার করতে চুক্তিবদ্ধ হন এবং ইফতারের পর অস্ত্রোপচার করা হবে বলে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ সিজার করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ইয়াছমিন এক ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু অপারেশন থিয়েটার থেকে তাকে কেবিনে স্থানান্তর করার পর শুরু হয় রক্তক্ষরণ।

তিনি বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসক ও নার্সদের জানানো হলে তারা আমার স্ত্রীকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেন। এরপরও রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় রাত ৯টার দিকে ইয়াছমিন নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে সেখানে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। এরপর আমি ও আমার স্বজনরা পাশের একটি হাসপাতাল থেকে ডাক্তার এনে ইয়াছমিনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাই। এ সময় তার পালস পাওয়া না গেলে, চিকিৎসক ও কর্র্তৃপক্ষ হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়।

ইয়াছমিন আক্তারের মা রাজিয়া আক্তার দাবি করেন, তাকে না জানিয়ে মেয়েকে হাসপাতালের নার্স দিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এতে মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

মারা যাওয়া প্রসূতির মামা পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম জানান, খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালের সামনে এসে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তার ভাগ্নিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। অ্যাম্বুলেন্সের চালক, হাসপাতালের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট কাউকেই তখন তিনি হাসপাতালে পাননি। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, চিকিৎসক ছাড়া নার্সের মাধ্যমে তার ভাগ্নির অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এতে তার মৃত্যু হয়েছে।

শ্রীপুর থানার এসআই এনায়েত কবির বলেন, হাসপাতালে ভাঙচুরের খবর পেয়ে শ্রীপুর থানার একাধিক টিম গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি, ততক্ষণে তারা পালিয়ে গেছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বজনরা লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রণয় ভূষণ দাস বলেন, আমরা খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে সেখানে চিকিৎসক পাঠিয়েছিলাম, কোনো জটিল রোগী ভর্তি আছে কি না তা দেখার জন্য। এরপর হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন কর্মকর্তার নির্দেশে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেব। এর আগেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

এদিকে ভাঙচুরের খবরে রাতেই লাইফ কেয়ার হাসপাতাল পরিদর্শন করেন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শোভন রাংসা। তিনি বলেন, হাসপাতালে ওই প্রসূতির স্বজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একই হাসপাতালে এ বছরের জানুয়ারি মাসে পারভীন আক্তার (৩৫) নামে এক নারীর শরীরে ভুল গ্রুপের রক্ত প্রবেশ করানোর অভিযোগ উঠেছিল। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর বিভিন্ন অপরাধে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই বছরের ১৩ মার্চ এই হাসপাতালে মোছা. শিমু নামে এক প্রসূতির ভুল চিকিৎসা করা হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয় কফিল উদ্দিন মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত