রাজিম দাদাবাড়ি, ইয়াম রাজিয়ার পাশে

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:২১ পিএম

"আজ রাজিয়া বেঁচে থাকলে...।" ফোনের ওপাশে কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না। হৃদয়ের গহিন থেকে একটা হাহাকার তীব্র হয়ে বের হয়ে আসতে চাইলো মোহাম্মদ ইয়াম রহমানের। ১৩ মার্চ রাতে তার জীবনে নেমে এসেছিল অমানিষার অন্ধকার। প্রিয়তমা স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন অনন্তলোকে। যাবার বেলায় উপহার দিয়ে গেছেন ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। হতভাগ্য স্বামী আজও মেনে নিতে পারছেন না তার প্রিয়তমার এভাবে চলে যাওয়া। তাই তো ছেলে রাজিম রহমানকে চট্টগ্রামে দাদীর কাছে রেখে ইয়াম ছুটে এসেছেন সাতক্ষীরায়। যেখানে চীরদিনের মতো শুয়ে আছেন স্ত্রী রাজিয়া খাতুন। ঈদের বিশেষ দিনটা রাজিয়ার কবরের পাশে কাটাবেন সাবেক এই ফুটবলার।   

সন্তান প্রসব করতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অকালে ঝড়ে যায় নারী ফুটবলার রাজিয়া খাতুনের জীবন। অথচ মৃত্যুর আগে অনাগত সন্তানকে নিয়ে কতই না পরিকল্পনা ছিল ফুটবল দম্পতির। প্রথম ঈদটা সন্তানকে নিয়ে কীভাবে কাটাবেন, কী কী রান্না করবেন, সব পরিকল্পনাই ইয়ামের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন রাজিয়া। অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সব কিছুই ওলোট পালট করে দিলো। ইয়ামকে তাই স্মৃতি হাতড়ে পাড়ি দিতে হবে জীবনের বাকী পথ।

মানুষের জীবনে ঈদ আসে অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে। পরিবার নিয়ে বিশেষ দিনটি কাটানোতেই যত আনন্দ। তার আগে থাকে কতই না প্রস্তুতি। অথচ ইয়ামের ঈদ প্রস্তুতি সবটাই রাজিয়া কেন্দ্রীক। সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জের লক্ষীনাথপুর গ্রামের কবরস্থানে রাজিয়ার ঠাই হয়েছে সাড়ে তিন হাত জমিনে। সেই কবরটাই পাঁকা করার ব্যবস্থা নিয়েছেন গাজীপুরে একটি গার্মেন্টসে চাকুরি করা ইয়াম, 'আমার ছেলে চট্টগ্রামে তার দাদির কাছে রেখে এসেছি। বাবুটার সঙ্গে ঈদ করার জন্য আমার ভাই-বোনরাও চট্টগ্রামে গিয়েছে। আমি সবাইকে বলেছি, তোমরা বাবুকে নিয়ে ঈদ করো। আমি আমার রাজিয়ার কাছে যাই।'

সন্তান রাজিমের সঙ্গে তার বাবা ইয়াম

রাজিয়ার মা ও ভাইয়ের সংসারে অভাব নিত্য সঙ্গী। ফুটবল খেলে যা কিছু পেতেন, তাই দিয়ে মা-ভাইয়ের ভরন পোষনের ব্যবস্থা করতেন রাজিয়া। এখন মেয়ে নেই। সংসারের চাকাও থেমে গেছে। শ্বাশুড়ির দুরাবস্থার কথা শোনা গেলো ইয়ামের কণ্ঠে, 'তাদের অবস্থা ভীষণ করুণ। রাজিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে মানবেতন জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। কেউ নেই তাদের দেখার। আমি গাজীপুরে ছোট একটা চাকুরি করি। যা বেতন পাই, তা দিয়ে ছেলের জন্য দুধের খরচও তু্লতে পারি না।'

অভাগা রাজিমের ভাগ্যে জুটেনি মায়ের দুধ। জন্মের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মায়ের মৃত্যু, সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে ফুটফুটে ছেলেটার। চিকিৎসকের পরামর্শে তাই তাকে খাওয়াতে হচ্ছে পটের দুধ। বিদেশী কোম্পানীর সেই পটের দুধ কিনতে গিয়ে রীতিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে ইয়ামকে, 'ল্যাকটোজেন দুধ খাওয়াচ্ছি বাচ্চাকে। একটা পট বড়জোড় তিন থেকে চার দিন যায়। প্রতি পটের মূল্য সাতশ টাকা করে। কিভাবে যে বাচ্চাটাকে বড় করবো, বুঝতে পারছি না।'

রাজিয়ার কবরের পাশে তার স্বামী ইয়াম

রাজিয়ার অকাল মৃত্যুর খবর পেয়ে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ান বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সভাপতি শেখ বশির আহমেদ মামুন। দিয়েছেন এক লাখ টাকা অনুদান। সেই অর্থ ছেলের জন্য স্থায়ী আমানত হিসেবে ব্যাংকে রেখেছেন ইয়াম। এর বাইরে কোন সহায়তাই কোন পর্যায় থেকে পাননি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোন লাভ হয়নি, 'বাফুফের সদস্য ও মহিলা কমিটির প্রধান কিরণ (মাহফুজা আক্তার) আপার কাছে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এ ব্যাপারে বাফুফের কিছু করার নেই। অথচ দীর্ঘ সময় রাজিয়া নারী ফুটবল দলের হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে খেলেছে। আমি নিজেও তো এক সময় ফুটবল খেলেছি। এতটুকু আশা কী আমি করতে পারি না? বেঁচে থাকলে এবারও কাচারিপাড়া দলের হয়ে রাজিয়ার আসন্ন লিগে খেলার কথা ছিল। আমি তো নিজের জন্য কিছু চাচ্ছি না। ছেলেটাকে মানুষ করতে, রাজিয়ার অসহায় মা-ভাইয়ের কথা ভেবে যদি কিছু সহায়তা পেতাম! সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের কাছে আহ্বান তারা যেন পরিবারটিকে দেখে।'

আজ বাদে কাল ঈদ। রমজানের শেষ বিকেলে স্ত্রীর কবরের পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ইয়াম। সযত্নে স্ত্রীর সদ্য পাকা করা কবরের ওপরটা ঢেকে দিলেন বাঁশের বেড়ায়। এভাবেই চির নিদ্রায় শায়িত রাজিয়ার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে যাবেন ইয়াম। সেটা প্রিয়তমাকে চিরতরে হারানোর যন্ত্রণা বুকে চেঁপে রেখে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত