সড়ক-মহাসড়কে কিছুদিন পর পরই ঘটছে বড় দুর্ঘটনা। অতিসম্প্রতি ফরিদপুর ও বরিশালের ঝালকাঠিতে দুটি দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ২৯ জন নিহত হয়েছে। এ কি কোনো আচানক-আচম্বিত ঘটনা? এসব ঘটনার কারণ জানতে পুলিশ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে সড়কে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা নেই।
তারা দেখতে পেয়েছে, সড়ক-মহাসড়ক অবৈধ যানবাহনে সয়লাব। এসবের চালকরা কাউকে তোয়াক্কা করে না; বিশেষ করে নসিমন, টমটম ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ির চলাচল বেপরোয়া। রাস্তায় তাদেরই নিয়ন্ত্রণ। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করে; এসবের কারণে বাস-ট্রাক-প্রাইভেট কার ঠিকমতো চলতে পারে না। ফলে হামেশা দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব অবৈধ যানবাহনের জন্যই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। এই যান ও বাহনগুলোর মালিকরা সড়ক-মহাসড়কসংশ্লিষ্ট মহলকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
দুর্ঘটনার বিষয়ে গত বুধবার দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়েছে। বৈঠক থেকে মহাসড়কে চাঁদাবাজদের তালিকা করার জন্য একটি বিশেষ নির্দেশনা-বার্তা পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া রাস্তার ঘেঁষে যেসব হাটবাজার রয়েছে, সেগুলো কীভাবে সরানো যায় তা নিয়ে বাজার কমিটির সঙ্গে বৈঠক করতে বলা হয়েছে।
বার্তায় বলা হয়েছে, চাঁদাবাজিতে পুলিশের কোনো সদস্য বা কর্মকর্তা, রাজনীতিক জড়িত থাকলে তাদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসড়কের দুর্ঘটনাগুলো আমাদের নাড়া দিয়েছে। দুর্ঘটনা রোধে আমরা কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন যাতে চলাচল করতে না পারে, সে জন্য পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বেশিরভাগ মহাসড়ক ঘেঁষে হাট-বাজার রয়েছে। কোথাও সড়কের দ্ইু পাশেই অবৈধ বাজার রয়েছে। এ কারণে ওই সব এলাকায় যানজট লেগে থাকে, প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। মহাসড়কে বাজার বসিয়ে নীরবে চাঁদাবাজিও চলে।
দুর্ঘটনা বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ট্রাফিক বিভাগ এক বছর ধরে একটি গবেষণা চালিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ বিবিধ। মহাসড়কে হাট-বাজার বড় এক কারণ। মহাসড়কের পাশের বাজারের একটি তালিকা করেছে পুলিশ। এসব বাজার নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। কিছু বাজার নামকাওয়াস্তে ইজারা নেন তারা। বেশিরভাগ বাজারেরই ইজারা নেওয়া হয় না। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাজারগুলোর একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে বছর তিনেক আগে পাঠিয়েছে পুলিশ।
মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্যও চলছে। নসিমন, টমটম ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ির মালিকরা চাঁদা দিয়ে দিন-রাত রাস্তায় এসব চালাচ্ছেন। দুর্ঘটনার জন্য এই যানবাহনগুলোকে দায়ী করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশের দুটি ইউনিট। প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও অসাধু পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত চাঁদা নিয়ে অবৈধ নসিমন, টমটম ও ভ্যানগাড়ি রাস্তায় চলতে দিচ্ছে। এসবের চালকরা বেপরোয়া।
পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতিবেদনটি নিয়ে গত বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরে একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক থেকে হাইওয়ে পুলিশ, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।
বার্তায় বলা হয়েছে, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লার নিমসার বাজার, দাউদকান্দির গৌরিপুর; চান্দিনা বাগুর বাসস্ট্যান্ড, কালাকুচয়া বাজার, দেবীদ্বারের কংশনগর, সুয়াগাজী, মিয়াবাজার, চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল (ফেনী), নাথেরপেটুয়া; ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের ভালুকার বরাডোবা, ভালুকা, চেলেরঘাট, বাঘামোরা, ত্রিশাল, হৈলরবাজার, কাজীরসিমলা, কানহর, তুরখাই; টাঈাইল মহাসড়কের মনতলা, সাহেব বাজার, ভাপাকিরমোড়, কালীবাড়ি বাজার, চেচুয়াখালী বাজার, গাবতলী; জামালপুর মহাসড়কের রসুলপুর, কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কানারামপুর, মাজার বাসস্ট্যান্ড, জালুয়ার বাজার, আমতলা; নান্দাইল চৌরাস্তা, তারেরঘাট; শেরপুরের গোপালপুর, উদালধর; তারাকান্দা দক্ষিণ, বাইমকান্দি, গোরদাড়, পাইসলা বাইপাস; রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের রাজাবাড়ি, হরিপুর, কামারপাড়া; নাটোরের বানেশ^র, ঝলমলিয়া; নওগাঁর নওদাপাড়া, নওহাটা, মৌগাছি, কেশরহাট, সাপাই; বরিশালের কাশিপুর, নতুলাবাদ, চৌমাটা; বাকেরগঞ্জের বোয়ালিয়া, রহমতপুর, জয়শ্রী, লাকুডিয়া বাজার এলাকায় যত্রতত্র অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে। রাস্তায় দেদার অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে।
অভিযোগ আছে, ওই সব বাজার ও অবৈধ যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা ওঠানো হয়। অবৈধ যানবাহনের জন্য বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার চলাচল করতে পারে না। এসবের কারণে প্রায়ই বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছেই। হতাহত হচ্ছে অনেকে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, বরিশালসহ বিভিন্ন সড়কে টমটম-নসিমন থেকে প্রতি মাসে অন্তত কোটি টাকার চাঁদা ওঠানো হয়। চাঁদাবাজিতে জড়িত রাজনৈতিক নেতাদের বেশিরভাগই শাসক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও চাঁদা আদায়ে জড়িত। তাদের তালিকা করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জেলায় জেলায় ট্রাস্কফোর্স করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। রাস্তায় চলাচলরত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না অদৃশ্য শক্তির হস্তক্ষেপের কারণে। মহাসড়কে নসিমন ও টমটম চলাচল নিষিদ্ধ। তারপরও চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কিছু সদস্য এবং কর্মকর্তা চাঁদা আদায় করে এ কথা সত্য। যারা এসব অপকর্মে জড়িত, তাদের একটি তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতেও বলা হয়েছে। যেসব গাড়ির ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশন এবং চালকের লাইসেন্স নেই, সেগুলোকেও শনাক্ত করতে বলা হয়েছে। সড়ক বা মহাসড়কে চাঁদাবাজি নয়, এ কথা সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
