বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জলদস্যুর হামলা রোধে ‘গার্ডিয়ান’

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৪ এএম

জলদস্যুর কবল থেকে মুক্ত থাকার জন্য জাহাজ মনিটরিংয়ে আন আর্মড সলিউশন (অস্ত্রবিহীন নিরাপত্তা) ব্যবস্থা চালু করেছে এমভি আবদুল্লাহর জাহাজ মালিক কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ মনিটরিং করবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি কোম্পানি। এই কোম্পানি স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই জাহাজের আশপাশে যত জাহাজ থাকবে সব জাহাজ স্ক্যান করে রিপোর্ট জাহাজের ক্যাপ্টেনকে দেবে। মূলত এমভি আবদুল্লাহ সোমালিয়ান জলদস্যুদের কাছে জিম্মির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছে কেএসআরএম।

আন আর্মড সলিউশন সম্পর্কে জানতে চাইলে কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমভি আবদুল্লাহর ঘটনার পর থেকে আমরা নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছি। আন আর্মড সলিউশন নামে এ চুক্তির প্যাকেজের নাম গার্ডিয়ান।’ এ প্যাকেজের আওতায় কী কী কাজ হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে মেহেরুল করিম বলেন, ‘আমাদের জাহাজের আশপাশে যত জাহাজ থাকবে সব জাহাজ স্ক্যান করে রিপোর্ট দেবে ক্যাপ্টেনকে। একই সঙ্গে সেসব জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের রিপোর্টও থাকবে। এতে করে জাহাজের ক্যাপ্টেন জানতে পারবেন তার জাহাজের আশপাশে হুমকি রয়েছে এমন কোনো জাহাজ রয়েছে কি না।’

কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ রুটে তো আর্মড ফোর্স নিতে বলা হয়েছে নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে। তাহলে কি আপনারা এটা নেবেন এ প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ রুটে যেখানে আর্মড ফোর্স নেওয়ার বিধান রয়েছে সেখানে অবশ্যই আমরা নেব। আর আন আর্মড সলিউশন সবসময়ের জন্য আমরা নিয়োগ দিয়েছি। তারা দিন হিসেবে আমাদের কাছ থেকে পেমেন্ট নেবে। আমাদের ২৫টি জাহাজেই তাদের এই মনিটরিং সিস্টেম থাকবে।’

এদিকে এ পদ্ধতিতে জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে জানান মেরিটাইম সেক্টরে অভিজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকে অটোনোমাস শিপিং নামে একটি পদ্ধতি মেরিটাইম সেক্টরে চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে দূর থেকে বা তীর থেকে কোনো জাহাজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনিটরিং করা হয়। আন আর্মড সলিউশন এটারই আরেকটি ভার্সন।’

২১ এপ্রিল দুবাই পৌঁছাবে এমভি আবদুল্লাহ : সোমালিয়ান জলদস্যুদের এলাকা পার হওয়ার পর এমভি আবদুল্লাহর গতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৬ নটিক্যাল মাইল থেকে ৭ নটিক্যাল মাইলে জাহাজ চালানো হয়েছিল এখন তা চলছে ১১ দশমিক ৫ থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল গতিতে। আর এজন্যই এমভি আবদুল্লাহ এক দিন এগিয়ে ২১ এপ্রিল দুবাইয়ের আল হারামিয়া বন্দরে পৌঁছবে বলে জানান ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম। তিনি বলেন, ‘আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের যে জাহাজ দুটি আমাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল তারাই গতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সোমালিয়ার সীমানা পার হওয়ার পর গতি বাড়িয়ে স্বাভাবিক গতিতে চলার জন্য নির্দেশনা দিলে আমরা এখন সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল গতিতে জাহাজ চালাচ্ছি। আর তাই এক দিন আগে দুবাই বন্দরে পৌঁছবে এমভি আবদুল্লাহ। সেখানে জাহাজে থাকা ৫৫ হাজার টন কয়লা খালাসের পর জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করবে।’

চট্টগ্রামে আসবে ১০ থেকে ১২ মে : চট্টগ্রামে কবে পৌঁছাতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম বলেন, দুবাইয়ে মালামাল খালাস করে ১০ থেকে ১২ মের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে পারে জাহাজ।

সব নাবিক জাহাজের সঙ্গে আসবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২৩ নাবিকের মধ্যে ২১ জন জাহাজের সঙ্গে আসবে। আর বাকি দুই নাবিক দুবাই থেকে বিমানে চট্টগ্রামে পৌঁছবে। সম্ভবত পরিবারের সঙ্গে তাদের জরুরি কাজ আছে তাই দুবাই থেকে চলে আসছে।’

কোন দুজন চলে আসবে তা জাহাজ মালিক কর্তৃপক্ষ জানায়নি। তবে অন্য এক সূত্রে জানা যায়, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ও স্টুয়ার্ড মোহাম্মদ নুর উদ্দিন দুবাইয়ে জাহাজ থেকে নেমে যাবেন। তারা বিমানে করে চট্টগ্রামে আসবেন।

এ বিষয়ে কথা হয় মোহাম্মদ নুর উদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করছেন। জাহাজে আপাতত কাজ করতে চাচ্ছেন না। তাই তিনি এখন নেমে যেতে চাইছেন। এখন ভিসা পেলে হয়তো বিমানে আসতে পারবেন।’

গত ১৩ এপ্রিল ভোর ৩টায় সোমালিয়ান দস্যুদের কাছ থেকে মুক্তি পায় এমভি আবদুল্লাহ ও ২৩ নাবিক। দস্যুদের ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনটি ওয়াটার প্রুফ লাগেজে উড়োজাহাজের মাধ্যমে এগুলো পানিতে ফেলা হয়। ডলার গণনার পর নিশ্চিত হয়েই জাহাজ ছেড়ে যায় ৬৫ জন জলদস্যু। গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে এমভি আবদুল্লাহ জলদস্যুদের কবলে পড়ে। সেকেন্ড অফিসার মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রথম অস্ত্র ঠেকিয়ে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণে নেয় জলদস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল।

এর আগে একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিকে ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল একই গ্রুপের জলদস্যুরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে নাবিক ও জাহাজটি উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত