যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:১১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে গণহারে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। বিক্ষোভের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে হোয়াইট হাউজ। গত সোমবার রাতে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মতো প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নানা শহরের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফিলিস্তিনপন্থি স্লোগানে এখন সোচ্চার। সব মিলিয়ে মার্কিন পুলিশ কতজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদে গতকাল মঙ্গলবার বলা হয়, পুলিশ নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে গত সোমবার রাতে ফিলিস্তিনপন্থিদের বিক্ষোভের তাঁবু তুলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে যান শিক্ষার্থীরা। এ সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত সোমবার দিনের প্রথম ভাগে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতেও একইভাবে কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি ক্লাস বাতিল করে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য হাইব্রিড ক্লাসের কথা জানানো হয়।

এসব ঘটনাকে ইহুদিবিদ্বেষী কর্মকান্ড আখ্যা দিয়ে যাচ্ছে হোয়াইট হাউজ। তারা এসব বিক্ষোভের নিন্দায় সরব হয়েছে।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগঠন হামাসের অতর্কিত আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরিক্রমায় যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিনপন্থি মনোভাবের পাশাপাশি ইসলামভীতির ঘটনাও বৃদ্ধি পায়।

গত সপ্তাহে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নিউ ইয়র্ক শহরের ক্যাম্পাসে তাঁবু স্থাপন করে ধারাবাহিক প্রতিবাদ শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। এরপর ক্যাম্পাসে তাঁবু গেড়ে অবস্থান নেওয়া প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় পুলিশ। এর পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

নিউ ইয়র্ক ও ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ফিলিস্তিনপন্থিরা তাঁবু খাটিয়ে বিক্ষোভ শুরুর পর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান, এমারসন কলেজসহ নানা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। কানেটিকাটের নিউ হ্যাভেনে ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রতিবাদকারীরা ক্যাম্পাসের চারপাশের রাস্তাগুলোতে যান চলাচল আটকে দেয়। সামরিক অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ঘোচানোর দাবিতে স্লোগান দেয় তারা। পরে পুলিশ সেখান থেকে ৪৫ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে।

নিউ ইয়র্ক পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, কর্তৃপক্ষ পুলিশকে ডাকার পর তারা ক্যাম্পাসে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করে।

২০০ দিনে ৩৪ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা : গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন গতকাল মঙ্গলবার ২০০তম দিন পার করল। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্মূল করার কথা বলে ইসরায়েল ছয় মাসেরও বেশি সময়ের আগ্রাসনে ৩৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি বর্বরতার নজির হিসেবে এখন গাজায় নানা জায়গায় গণকবর স্পষ্ট হচ্ছে। নাসের হাসপাতালে সর্বশেষ আরও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে গণকবর থেকে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদে গতকাল বলা হয়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজায় এ পর্যন্ত ৭৫ হাজার টন বিস্ফোরক ফেলেছে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিসহ অবকাঠামোগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। মানুষের বসতি থেকে শুরু করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রার্থনাকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। প্রতিনিয়ত এ বিপর্যয়ের পরিধি বাড়ছে। গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে গতকাল পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয় ৩৪ হাজার ১৮৩ জন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে ৭৭ হাজারেরও বেশি মানুষ।

গাজায় ইসরায়েল তার দীর্ঘ আগ্রাসনের মাধ্যমে ৩ লাখ ৮০ হাজার আবাসিক ভবন ধ্বংস করে। ৪১২টির মতো স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়। মসজিদ ধ্বংস করে ৫৫৬টি আর গির্জা তিনটি। এ ছাড়া ২০টির মতো প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থান ধ্বংস করে দেয়। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২টি হাসপাতাল ও ৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আক্রমণ করে। অ্যাম্বুলেন্স আক্রমণ করে ১২৬টির মতো। অর্থমূল্যে ইসরায়েলি ধ্বংসলীলার পরিমাণ ৩ হাজার কোটি ডলার।

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিস থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ইসরায়েল। তারপরই এ শহরের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। হাসপাতালে আবিষ্কৃত গণকবরটি থেকে প্রায় ৩০০টির মতো মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার উদ্ধারকর্মীরা।

খান ইউনিসের সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক কর্নেল ইয়ামেন আবু সুলেমান বলেন, ‘নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে পাওয়া গণকবর থেকে সোমবার ৭৩টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ২৮৩টি মরদেহ পাওয়া গেল এ গণকবরে।’

তিনি অভিযোগ জানান যে, কিছু মৃতদেহ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে তাদের গলায় ফাঁসির চিহ্ন রয়েছে। তাদের জীবিত কবর দেওয়া হয়েছিল নাকি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল, তা জানা যায়নি।’ তবে বেশিরভাগ মৃতদেহই পচে গেছে বলেও জানান সুলেমান।

এর আগে খান ইউনিসের সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র এবং অনুসন্ধান মিশনের প্রধান রায়েদ সাকার জানিয়েছিলেন যে, ৭ এপ্রিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সদস্যদের প্রত্যাহারের পর থেকে তারা ৪০০ নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান করছেন।

গণকবরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নাকচ করে দিয়ে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা জিম্মি শনাক্ত করতে গণকবরের অনুসন্ধান চালিয়েছেন।

গণকবরের ঘটনা সামনে আসার পর জাতিসংঘের অধিকার গোষ্ঠীর প্রধান ভলকার টার্ক বলেন, নাসের এবং আল-শিফা হাসপাতালে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তিনি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর তদন্ত আহ্বান করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত