স্মার্টের ফাঁদে ৫ লাখ লাইসেন্স

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৯ এএম

সব প্রক্রিয়া শেষ করেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে চালকের সনদ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড পাচ্ছেন না পাঁচ লাখের মতো আবেদনকারী। ঢাকার এক সার্কেলেই আটকে আছে প্রায় দেড় লাখ আবেদন। কারণ কার্ড সরবরাহ করতে পারছে না সংস্থাটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

কাক্সিক্ষত স্মার্ট কার্ডের আশায় মাসের পর মাস বিআরটিএর জেলা ও সার্কেল অফিস থেকে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে ঘুরছেন লাইসেন্সপ্রত্যাশীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড না মেলায় চাকরি পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চালক পদে আবেদনকারী  অনেকেই। জীবিকার তাগিদে অনেকের বিদেশযাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া লাইসেন্স নবায়ন করে স্মার্ট কার্ড না পাওয়ায় কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেক পেশাদার চালক।

এক বছর ধরে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য দিন গুনছেন পাবনার মো. আবদুল্লাহ। কিন্তু সব ঠিকঠাক

থাকলেও ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড না পাওয়ায় যেতে পারছেন না। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ কার্যালয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সিস্টেমের এত খারাপ অবস্থা, শুধু নামেই ডিজিটাল হয়েছে! একটি স্মার্ট কার্ডের জন্য দফায় দফায় এই অফিসে হাজিরা দিচ্ছি, শুধু তারিখ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। কিন্তু কার্ড আর পাচ্ছি না। অথচ এই কার্ড হলে আমি খুব সহজেই বিদেশে যেতে পারি। এখন পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।’

বিআরটিএর তথ্যমতে, কার্ডের সংকট থাকায় পাঁচ লাখের মতো আবেদন ঝুলে আছে। ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১ (মিরপুর) এই এক সার্কেলেই আটকে আছে ১ লাখ ৪৮ হাজার আবেদন। ঢাকা জেলা সার্কেল ইকুরিয়াতে আছে ৪০ হাজার। তবে জরুরি প্রয়োজনে বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করে স্মার্ট কার্ড পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সংখ্যা খুবই কম। সম্প্রতি বিমানবন্দরে কার্ডের বড় একটি চালান এসেছে।

ছয় মাস ধরে সার্কেল অফিসে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত আইয়ুব আলী নামে এক বিদেশগামী লাইসেন্সপ্রত্যাশী এসেছেন রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে। সেখানে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা কার্ডের জন্য আর কোথায় গেলে সেটি পাওয়া যাবে? ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২ ইকুরিয়া অফিস থেকে কার্ডের জন্য এই বনানীতে আসতে বলেছে। কিন্তু এখানে এসে তো আরও বেশি সমস্যায় পড়ে গেলাম। প্রতি সপ্তাহে এই অফিসে এসে ঘুরে যাচ্ছি। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। কবে নাগাদ এই কার্ড পাব, সেটি কেউ বলতে পারছেন না। এখন এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে সময় যাচ্ছে, না পারছি দেশে কোনো কাজ করতে, না পারছি বিদেশে যেতে।’

আইয়ুব আলীর মতোই চট্টগ্রাম থেকে মো. সেলিম নামে আরেক লাইসেন্সপ্রত্যাশী এসেছেন বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে একদিকে চাকরির চরম সংকট। অন্যদিকে আমার মতো লাখ লাখ মানুষ আজ বাইরে যেতে পারছেন না শুধু একটি স্মার্ট লাইসেন্স কার্ডের জন্য। অথচ বিদেশগামীদের যদি সরকার একটু সহযোগিতা করত, তাহলে আমরা সবাই সময়মতো কার্ড পেয়ে যেতাম। সেই সঙ্গে পরিবার এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারতাম। কিন্তু এখন কোনো কিছুই পারছি না একটি কার্ডের জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে এই কার্ডের জন্য মাঝেমধ্যেই ঢাকায় আসতে হয়। এজন্য যে টাকা খরচ হচ্ছে, সেগুলো তো আর কেউ দেবে না। কিন্তু বিআরটিএ যদি এ বিষয়ে আরও বেশি দায়িত্ববান হতো, তাহলেই এই স্মার্ট কার্ড পেয়ে যেতাম।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বিআরটিএর জেলা ও ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেল কার্যালয়। মো. আরিফ নামে ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলে আসা আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘যে কাগজ দিয়েছে সেটির অবস্থা খুব খারাপ। রাস্তায় বের হলে সার্জেন্ট অনেক সময় মামলা দিয়ে দেয়। কারণ বছরের পর বছর ঘুরে এই কাগজের নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। অন্যদিকে বিআরটিএতে কার্ড দেওয়ার দিন এলে তারিখ শুধু বদলে দেয়। কার্ড আর পাচ্ছি না।’

বিআরটিএকে লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স (এমএসপি) প্রাইভেট লিমিটেড। তারা বলছে, ডলারসংকটের জন্য তারা কার্ড আমদানি করতে পারছে না। যখন চুক্তি হয় তখন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৫ টাকা; যা এখন ১০৯ টাকা।

মাদ্রাজ প্রিন্টার্সের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক আশরাফ বিন মুস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানি জটিলতায় কার্ড আনতে কিছু সমস্যা আছে। সেই সঙ্গে ডলারের একটা ক্রাইসিস আছে। কার্ড যদি থাকে তাহলে তিন মাসের মধ্যে পাঁচ লাখ কার্ড প্রস্তুত করার সক্ষমতা আমাদের আছে। তবে আশা করি সামনে এই কার্ড সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড নিয়ে ভোগান্তি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি স্মার্ট কার্ডের জন্য মানুষ বছরের পর বছর বিআরটিএতে ঘুরেও কার্ড পাচ্ছে না। বিশেষ করে যারা বিদেশে যেতে চান ড্রাইভিং ভিসায় তারা এই কার্ডের জন্য যেতে পারছেন না। আর অনেক চালক আছেন নতুন করে লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে তাদের কার্ড এখনো পাননি। অনেক চালক ভালো কোম্পানিতে চাকরি পাচ্ছেন না এই কার্ডের জন্য। অনেকে বেকারও হয়ে গেছেন। তা ছাড়া সরকার এত টাকা বরাদ্দ দেয় বিআরটিএকে। একটি মেশিন কিনে বিআরটিএ তো চাইলে নিজেরাই কার্ড তৈরি করতে পারে। তাহলে এই কার্ডের জন্য মানুষকে আর ভোগান্তি পোহাতে হয় না।’

স্মার্ট কার্ডের সংকটের বিষয় বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিআরটিএ এখন অনেক আধুনিক হয়ে গেছে। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যায়। স্মার্ট কার্ডের কিছু সংকট আছে। তবে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য যাদের কার্ড প্রয়োজন তাদের আবেদনের মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তা ছাড়া বিমানবন্দরে তিন লাখের মতো কার্ড এসে গেছে। আশা করছি খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত