পরকালের সফলতাই আসল সফলতা। আর পরকালের সফলতা হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করা। মুমিন ব্যক্তি পরকালে সফল হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেবল কেয়ামতের দিনই তোমাদের তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
মুমিন ব্যক্তি একটি কারণে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তা হলো তার ইমান। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। (সহিহ বুখারি)
অতএব মুমিনের জান্নাতের গ্যারান্টি রয়েছে। বাকি রইল জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া। হাদিস থেকে জানা যায়, পাপী মুমিনরাও জাহান্নামে শাস্তি পাওয়ার পর অবশ্যই জান্নাতে যাবে। আবার অনেকে শুরু থেকেই জান্নাতে যাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে। তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচায়, এমন আমলের ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া উচিত। নিচে এমন কয়েকটি আমল তুলে ধরা হলো।
দান-সদকা : আদি ইবনে হাতিম (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো। এরপর তিনি পিঠ ফেরালেন এবং মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আবার বললেন, তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো। এরপর তিনি পিঠ ফেরালেন এবং মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তিনবার এরূপ করলেন। এমনকি আমরা ভেবেছিলাম যে, তিনি বুঝি জাহান্নাম সরাসরি দেখছেন। তিনি আবার বলেন, তোমরা একটি খেজুর দিয়ে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো। আর যদি কেউ সেটাও না পাও তাহলে উত্তম কথার দ্বারা হলেও (আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করো)। (সহিহ বুখারি)
রোজা : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার বিনিময়ে জাহান্নাম থেকে তার মুখমণ্ডলকে সত্তর বছরের দূরত্বে রাখেন। (ইবনে মাজাহ)
শিরকমুক্ত ইবাদত : আবু আইয়ুব (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (স.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যে আমল আমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। রাসুল (সা.) বললেন, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে। সে ব্যক্তি চলে গেলে রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, তাকে যে আমলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা দৃঢ়তার সঙ্গে পালন করলে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ মুসলিম)
আরাফার দিনে জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া : আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের আরাফার দিনের চেয়ে জাহান্নাম থেকে বেশি মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি সেদিন বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন, তাদের নিয়ে ফেরেশতাগণের কাছে গর্ববোধ করে বলেন, এরা কী চায়? (অর্থাৎ যা চায় আমি তাদের তাই দেব)। (মেশকাত)
জোহরের সুন্নত আদায় : উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি জোহরের ফরজের আগে চার রাকাত নামাজ পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন।’ (তাবরানি)
আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করা : আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, যে মুমিন বান্দার দুই চোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে পানি বের হয়, যদি তা মাছির মাথার পরিমাণও হয় এবং তা চেহারা বেয়ে পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন। (ইবনে মাজাহ)
সরলতা ও নম্রতা : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সহজ-সরল, নম্র-ভদ্র ও বিনয়ী হবে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।’ (মুসতাদরাক হাকিম) অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছে সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী। (তিরমিজি)
আল্লাহর পথে কষ্ট করা : হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর পথে যে বান্দার দুই পা ধুলায় মলিন হয়, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে এমন হতে পারে না। (সহিহ বুখারি)
৪০ দিন জামাতে নামাজ আদায় করা : হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে একাধারে ৪০ দিন তাকবিরে উলার (ইমামের প্রথম তাকবিরের) সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করবে, তাকে দুটি নাজাতের ছাড়পত্র দেওয়া হবে। এক. জাহান্নাম থেকে মুক্তি। দুই. মোনাফেকি থেকে মুক্তি। (তিরমিজি)
প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে হলে উল্লিখিত আমলগুলোর ব্যাপারে মুমিন মুসলমানের বেশি সচেতন ও যত্নশীল হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করার তওফিক দান করুন এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
