প্রচন্ড গরমে হিট স্ট্রোকের পাশাপাশি মানুষের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করবেন জানালেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের প্রফেসর ডাক্তার জহিরুল হক চৌধুরী
খাবারে সচেতনতা
প্রচ- গরমে তৃষ্ণার্ত হলে অনেকে বাইরের শরবত খান। এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। এটা ডায়রিয়া ও ডায়রিয়াজনিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া জন্ডিস, টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগেরও কারণ হতে পারে। রাস্তার পাশের খোলা খাবারে মাছি ও ধুলাবালি পড়ে। অনেক সময় বাসিও থাকে। তাই বাইরের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। অতিরিক্ত গরমে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই খাবার খেলে বদহজমসহ ওপেটের পীড়া হতে পারে।
গরমে নিজের ঘরে খাবার অনেকক্ষণ ফ্রিজের বাইরে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। তাই খাবার খাওয়ার সময় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। খাবার যেন টাটকা ও হালকা হয়। গরুর ও খাসির মাংসের মতো চর্বিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে। শাকসবজি, ফল খাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে হবে। ঘরের তৈরি খাবার খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। চা-কফি ও কোমল পানীয় কম খাওয়া। ভাজাপোড়া খাবার না খাওয়াই ভালো। শরীর দুর্বল লাগলে, ক্লান্ত লাগলে, মাথা ঘুরালে পানির মধ্যে একটু লবণ মেশানো যেতে পারে। যেহেতু ঘামের সঙ্গে লবণটা বেরিয়ে যায়। প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন খেতে পারেন। তপ্ত গরমে বাইরে খাবার যত কম যাওয়া যায় তত ভালো। পানি, লেবুর শরবত, ডাব, ওরস্যালাইন ও ফলের রস এগুলো খেতে হবে।
যে সমস্যা হতে পারে
তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন বয়স্ক, শিশুরা। শারীরিকভাবে অসুস্থ যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, হার্টের বা ক্যানসারের রোগী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। দিনের বেলায় প্রচন্ড রোদে কায়িক পরিশ্রম করেন, তাদের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। গরমের কারণে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। প্রচুর ঘামের কারণে পানির সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা অবহেলা করলে তা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। যারা বাইরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে কাজ করেন এবং প্রয়োজন মতো পানি পান করার সুযোগ পান না, তারাই মারাত্মক ধরনের পানিস্বল্পতায় আক্রান্ত হন। এ ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতর সমস্যায় পরতে পারেন। গরমে ত্বকে ঘামাচি এবং অ্যালার্জি হতে পারে। অনেক সময় ঘাম ও ময়লা জমে ঘর্মনালির মুখ বন্ধ হয় এবং সেখানে ইনফেকশন হতে পারে। এতে ঘামাচি ও অ্যালার্জি বেড়ে যায় এবং ঘামে প্রচুর গন্ধ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ঘাম ও ময়লার কারণে ছত্রাকজনিত রোগও এ সময় বেশি হয়। গরমে যারা সরাসরি সূর্যের আলোর নিচে বেশিক্ষণ থাকেন, তাদের ত্বক পুড়ে যায়। এতে ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া করে, চুলকায় এবং ফোসকা পড়ে। মূলত সানবার্ন হয়। গরমের সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো হিটস্ট্রোক। হিট স্ট্রোকের শুরুতে হিট ক্র্যাম্প দেখা দেয় যাতে শরীর ব্যথা করে, দুর্বল লাগে এবং প্রচন্ড পিপাসা পায়। পরে হিট এক্সহসশন দেখা দেয়। এতে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, মাথাব্যথা করে এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে হিটস্ট্রোক হতে পারে। এর লক্ষণগুলো হলো তাপমাত্রা দ্রুত ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায়, ঘাম বন্ধ, ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যায়, নিঃশ্বাস দ্রুত, নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, রক্তচাপ কমে যায়, খিঁচুনি হয়, মাথা ঝিমঝিম করে এবং রোগী অসংলগ্ন ব্যবহার করতে থাকে। রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, অজ্ঞান হয়ে যায়, এমনকি রোগী শকেও চলে যেতে পারে।
তাপপ্রবাহের সময় আর্দ্রতা বেশি থাকলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঘাম বের হলে শরীর ঠান্ডা হয়। তবে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম বের হতে পারে না। ফলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে অস্বস্তিকর সমস্যার সষ্টি হয়। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তীব্র গরমে অনেকের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রচন্ড গরমে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় যেটা তীব্র মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সৃষ্টি করে।
যা করতে হবে
প্রয়োজন ছাড়া দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে না যাওয়া। যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা। বাইরে বের হলে সরাসরি রোদ যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলা। প্রয়োজনে মাথায় কাপড়, টুপি বা রঙিন ছাতা ব্যবহার করা। হাল্কা, ঢিলেঢালা, সুতি কাপড় পরিধান করা। শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা। বাইরে বেরোনোর আগে ৫০ এসপিএফের ওপর সানস্ক্রিন শরীরের উন্মুক্ত স্থানে লাগাবেন। রোদের মধ্যে যারা কাজ করেন তারা ছাতা ব্যবহার করবেন। মাঝেমধ্যে শীতল স্থান বা গাছের নিচে হলেও বসার চেষ্টা করবেন। প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। যেহেতু ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, তাই লবণযুক্ত পানীয় যেমন স্বাভাবিক পানিতে খাবার লবণ মেশাতে পারেন অথবা খাবার স্যালাইন পান করতে পারেন। অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে।
চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা প্রযোজনে দুই থেকে তিনবার গোসল করতে পারেন। শিশুদের বেলায় আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। বাচ্চারা যাতে এ সময়টাতে স্কুলে গিয়ে বাইরে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় যথেষ্ট পানি সঙ্গে দিন। ফুলপ্যান্টের বদলে হাফপ্যান্ট পরাতে পারেন। বয়স্কদের বেলায় বিশেষ করে যাদের অন্যান্য রোগ আছে তারা যতদূর সম্ভব রোদে চলাফেরা এড়িয়ে চলুন। গরমে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে দৈনিক ৮ ঘণ্টা ঘুমানো। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ ম্যানেজ করতে হয়।
গরমে অসুস্থ হলে
রোগীকে দ্রুত শীতল কোনো স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ফ্যান বা এসি ছেড়ে দিতে হবে, সম্ভব না হলে পাখা দিয়ে বাতাস করতে হবে। রোগীর টাইট জামা কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে ফেলতে হবে। চোখে, মুখে এবং ঘাড়ে পানি দিতে হবে মুখে খেতে পারলে রোগীকে প্রচুর পানি ও খাবার স্যালাইন পান করতে দিতে হবে। যদি কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয় এবং অজ্ঞান হয়ে যায়, তবে রোগীকে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
