উত্তরের গরম দক্ষিণে

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৮ এএম

একসময় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজশাহী বিভাগের ঈশ্বরদী, রাজশাহী, পাবনা প্রভৃতি এলাকায় বিরাজ করত। এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রেকর্ডও বগুড়ায়, যা ১৯৮৯ সালের ২১ এপ্রিল হয়েছিল। এ ছাড়া গত বছরের ১৭ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল পাবনায়। অর্থাৎ, দেশের পশ্চিম-মধ্যাঞ্চলের উত্তরাংশের জেলাগুলোতে ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব। কিন্তু এবার তা একটু দক্ষিণে নেমে এসেছে। এ বছর খুলনা বিভাগের যশোর, চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রার হার বেশি। গত ২০ এপ্রিল যশোরে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পর গত শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় রেকর্ড হয়েছে ৪২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

শুধু তাই নয়, দেশের গত ৪০ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত নিয়ে নরওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের দক্ষিণাংশের কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও সিলেটে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি বেড়েছে ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, নোয়াখালীর মাইজদী, কক্সবাজার, শ্রীমঙ্গল, রংপুর ও ভোলায়।

আবহাওয়ার উপাত্ত নিয়ে নরওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষে গবেষণা করেছেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ। চলতি মৌসুমের টানা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি থাকা প্রসঙ্গে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আগে রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেশি বিরাজ করত এবং এবার একটু দক্ষিণে নেমে এসেছে। আমাদের দেশে সাধারণ পশ্চিম-মধ্য এলাকার জেলাগুলোতে তাপমাত্রা বেশি থাকে। এবার গরমের তাপপ্রবাহ একটু নিচে (দক্ষিণ দিকে) নেমে গেছে।’ তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ রকম হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের নদ- নদীগুলোর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানে পানির প্রবাহ কমায় তাপমাত্রা বেশি বিরাজ করতে পারে।’

কিন্তু কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি বা সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বাড়ছে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে বজলুর রশিদ বলেন, ‘ওই এলাকার পাহাড়গুলোতে থাকা গাছপালা থেকে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প বাতাসে নিঃসৃত হতো, এখন হয়তো গাছপালা বিনাশের কারণে তা হচ্ছে না। তাই সেখানকার গড় তাপমাত্রা বাড়ছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিশিয়ালি বিবৃতি অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণের খুলনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ দশমিক ১ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি থাকার কথা। কিন্তু গত ৪০ বছরের গবেষণা উপাত্তে পাওয়া যায় ৩৪ দশমিক ৭ ও সর্বনিম্ন ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি বেড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্বের কক্সবাজারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ দশমিক ১ ও সর্বনিম্ন ২৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকার কথা। কিন্তু ৪০ বছরের উপাত্তে গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পাওয়া গেছে ৩২ দশমিক ৭ এবং সর্বনিম্ন ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৬ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। একইভাবে দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি।

এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান বলেন, ‘দক্ষিণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে নদীগুলো ছিল সেগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া। কিংবা গতি হারানোর কারণে ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়তে পারে।’ তিনি বলেন, একটি বহমান নদী যে এলাকার পাশ দিয়ে যাবে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গরমের তীব্রতা কম থাকবে। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে নদীগুলো বহমান নেই এবং সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশের হার বেড়ে গেছে। আর লবণপানি অতিরিক্ত তাপ শোষণ করার ফলে স্বাভাবিকভাবেই গরম বেশি পড়ছে।

৪৫ বছর ধরে সমুদ্র বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ওশেনোগ্রাফি বিভাগের ইউজিসি অধ্যাপক প্রফেসর ড. আফতাবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এলনিনো ও লানিনার প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে উষ্ণ পানি ভারত মহাসাগরের দিকে আসছে। আর এর প্রভাবে আমাদের বঙ্গোপসাগরের পানি উষ্ণ হতে পারে, অস্বাভাবিক নয়। আর বর্তমান সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তাপপ্রবাহ এ কথাই প্রমাণ করে।’

বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে স্বীকার করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘সাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কোনো গবেষণা উপাত্ত নেই। এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে সবুজ কমে যাওয়া কিংবা জলাশয় ও বনায়ন কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশে।’

দেশে ২৭ দিন ধরে তাপপ্রবাহ বইছে। এই ধারা আরও অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, ‘আগামী ২ মে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর তা হলে গরমের তীব্রতা কমে আসতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত