যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না মার্কিন প্রশাসন। এখন চলছে গণগ্রেপ্তার। আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির মনোনীত প্রার্থী জিল স্টাইনকে বিক্ষোভস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরেই চলছে গ্রেপ্তারের অভিযান। বিক্ষোভ দমনে চূড়ান্ত আগ্রাসী অবস্থানে মার্কিন প্রশাসন। অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফিলিস্তিনপন্থি এই বিক্ষোভ ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গ্রিন পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জিল স্টাইনকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে তাকেসহ প্রায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত এক সপ্তাহে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করায় প্রায় ৫৫০ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময়ে নানা বিক্ষোভ হয়েছে। বর্ণবাদী বৈষম্য, বৈশি^ক উষ্ণায়ন কিংবা বন্দুক-সহিংসতার মতো ঘটনার প্রতিবাদে মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এসব বিক্ষোভে মার্কিন প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই দেখায়। তবে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার কারণে ৩৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বিক্ষোভ যেন কর্তৃপক্ষের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউ ইয়র্কের মেয়র এরিক অ্যাডামস নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিক্ষোভকে ‘পেশাদার দুষ্কৃতির অস্থির কর্মকান্ড’ আখ্যা দেন। শহর কর্তৃপক্ষ নিউ ইয়র্কের ওয়াশিংটন পার্ক স্কয়ার ঘেরাও করেছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছে এবং নিজেদের দাবির কথা বলছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার চারপাশে পুলিশের গাড়ির অবস্থান দেখা গেছে। গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে ২৩ জন ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের ১৬ জনই শিক্ষার্থী। নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাল পলি হামবোল্ডটের দুটি ক্যাম্পাসেই সক্রিয় ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে কর্তৃপক্ষ বাকি সেমিস্টারের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা এখনো ক্যাম্পাসে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছে। গত শুক্রবার রাতে বোস্টনের ইমারসন কলেজ থেকে কমপক্ষে ১০০ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। জর্জিয়ার ইমোরি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ওপর গত বৃহস্পতিবার রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছোড়ে পুলিশ। ওইদিন দর্শন বিভাগের প্রধান নো লি ম্যাকাফিকে গ্রেপ্তারের পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের মারধর করার পাশাপাশি তাদের মাটিতে চেপে ধরার ঘটনাও ঘটেছে। এখন ইমারসন কলেজই বিক্ষোভের কেন্দ্র।
নিউ ইয়র্ক শহরের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ডাকায় এর প্রেসিডেন্ট মিনোশি শফিকের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তাব পাস হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ফিলিস্তিনের সংঘাত থেকে লাভবান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে।
গত সোমবার নিউ ইয়র্ক পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ শাখা ‘স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স গ্রুপ (এসআরজি)’-এর সদস্যদের ডেকে পাঠায় নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। তারা এসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ইসরায়েল বোমা মারছে, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি তার জন্য টাকা দিচ্ছে; আপনারা কত শিশুকে মারলেন আজ?’
কয়েক দিন আগে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভের আয়োজন করলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলে, ‘আইভি লিগ কলেজভুক্ত আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের অধিকার থাকলেও অন্য শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস জীবন দুর্বিষহ করার কিংবা হয়রান করার অধিকার তাদের নেই।’
পরে বিক্ষোভ দমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মিনোশি শফিক এসআরজি সদস্যদের ডাকেন। এরআরজি সদস্যরা গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করে। পরে অবশ্য অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপরই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। ইসরায়েলের জন্য ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের অর্থসহায়তা পাসের বিল উত্থাপনকালে অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গত বুধবার তিনি যান কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। তাকে উদ্দেশ্য করে বিক্ষোভকারীরা বলে, ‘আমাদের ক্যাম্পাস থেকে চলে যাও।’ জবাবে জনসন ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করতে থাকো।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্যের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এ নিয়ে বিরক্ত ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীরা। ‘কলাম্বিয়া স্টুডেন্টস ফস জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন’-এর তরফ থেকে বলা হয়, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে ঘৃণা ও গোঁড়ামিপূর্ণ যেকোনো অবস্থানের বিরোধী। একই সঙ্গে আমাদের সংহতিমূলক অবস্থান ভ-ুল করতে আসা অ-ছাত্রদের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের অবস্থান ব্যক্ত করছি।’ বিক্ষোভকারীরা জানায়, কিছু কিছু গণমাধ্যম এমন কারও কারও বক্তব্যকে তুলে ধরছে, যারা আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
আগামী সপ্তাহে কলাম্বিয়ার ইউনিভার্সিটির সেমিস্টার শেষ হতে চলেছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, হয়তো বিক্ষোভও থামবে। তবে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত তারা সরবে না। শিক্ষার্থীরা বলছে, গুগল, মাইক্রোসফট এবং আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পাশাপাশি তেল আবিব ইউনিভার্সিটির সঙ্গে অংশীদারির অবসান চায় শিক্ষার্থীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট চার্লস এম ব্লো বলেন, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের প্রশ্নে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিভাজিত বাস্তবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৬৮ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষও হয়েছিল।
