দেশে প্রথমবারের মতো মরণোত্তর দেহদান করেছিলেন স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। মৃত্যুর আগে এই প্রগতিশীল প্রথাবিরোধী লেখক তার মরদেহ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবাচিম) দান করে গিয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে মৃত্যু হলে শেবাচিমে তার দেহ রাখা হয় এবং মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা মানুষের শারীরবৃত্তীয় বিষয়ে জানতে, শিখতে এবং গবেষণা করতে তা কাজে লাগান। আরজ আলী মাতুব্বরের মরদেহ দান করে যাওয়ার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশে মরণোত্তর দেহদানের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। মৃত্যুর আগে অনেকেই দেহদানের অঙ্গীকার করে গেলেও সামাজিক ও পারিবারিক বাধার কারণে মরদেহ মেডিকেল কলেজে হস্তান্তরের সংখ্যা বাড়ছে না। তবে মরণোত্তর দেহদানের প্রতিশ্রুতি বাড়ছে।
মানুষকে মরণোত্তর দেহদানে উদ্বুদ্ধ করতে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হয়ে আমৃত্যু কাজ করতেন স্থপতি ও কবি রবিউল হোসাইন। তিনি নিজেও মৃত্যুর পর তার মরদেহ মেডিকেল কলেজে দান করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু রবিউলের মৃত্যুর পর এক আত্মীয় দেহদানে প্রবল বাধা সৃষ্টি করেন। ফলে বাধ্য হয়ে তার মরদেহ দাফন করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, সদ্যমৃত কোনো ব্যক্তির দান করা মরদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে কমপক্ষে ৮ জনের জীবন বাঁচানো সম্ভব। মৃত মানুষের অঙ্গ রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হলে সংশ্লিষ্ট রোগী সুস্থ জীবন ফিরে পেতে পারে। পুরো মানবদেহই দান করা যায়, আবার হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, প্যাংক্রিয়াস, অস্থি, অস্থিমজ্জাও দান করা যায়। এর বাইরে চোখ বা কর্নিয়া, হাড়, ত্বক, হার্ট ভালভ, ব্লাড ভেসেল, নার্ভ ও টেন্ডনও দান করা যায়।
দেশে এখন পর্যন্ত কতজন ব্যক্তি মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেছেন এবং মৃত্যুর পর কতজনের দেহ পাওয়া গেছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানও তৈরি করা হয়নি।
ফলে বিক্ষিপ্তভাবে মেডিকেল কলেজগুলোতে দেহদান করা হয় এবং তারা নিজেদের তত্ত্বাবধানে তা সংরক্ষণ করে শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করেন। মেডিকেল কলেজগুলোর অ্যানাটমি শিক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের শারীরবৃত্তীয় বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে মরণোত্তর দেহের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে মরদেহ কম থাকার কারণে মেডিকেলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। একটা সময় বেওয়ারিশ মৃতদেহের ওপর নির্ভর করে মেডিকেল কলেজের শিক্ষা চলত, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে এখন বেওয়ারিশ মৃতদেহের সংখ্যাও কমে গেছে।
১৯৯৮ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) অ্যানাটমি বিভাগে মরণোত্তর দেহ গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে এ পর্যন্ত ১২টি মরদেহ তারা পেয়েছে। এ ছাড়া আরও ৬৯ জন মৃত্যুর পর দেহদানের অঙ্গীকার করেছেন। ঢামেকে যারা মরদেহ দান করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী, ব্লগার অভিজিৎ রায়, সীমা রায়, অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস ও মৈত্রীয় চট্টোপাধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অ্যানাটমি বিভাগ এখন পর্যন্ত ৬৫টি মরণোত্তর দেহ পেয়েছে। এর বাইরে আরও শতাধিক ব্যক্তি মৃত্যুর পর তাদের দেহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগে দান করার অঙ্গীকার করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগে ভাষাসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ, সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পঙ্কজ ব্যানার্জি, নোয়াখালী গান্ধী আশ্রমের ঝর্ণাধারা চৌধুরী ও শিখা ব্যানার্জি মরদেহ দান করেছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে মরণোত্তর দেহদানের যারা অঙ্গীকার করেছেন তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের মরদেহ পেয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ মাত্র দুটি করে মরণোত্তর দেহ পেয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লায়লা আঞ্জুমান বানু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অঙ্গীকার অনুযায়ী কারও মৃত্যুর পর আমাদের বিভাগে তার পরিবার যখন মরদেহ দান করে, তখন আমরা তা প্রিজারভ (সংরক্ষণ) করে রাখি। এরপর শিক্ষার্থীদের আমরা সেই মরদেহের বিভিন্ন অংশ ব্যবচ্ছেদ করার মাধ্যমে শিক্ষা দিই। শিক্ষার্থীরা মানুষের শরীরের কোন অংশ দিয়ে কী গেছে তা এই মরদেহ থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা পায়। ১ম ও ২য় বর্ষের অ্যানাটমির শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাই হচ্ছে এর ওপর। অ্যানাটমির শিক্ষার্থীদের মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। এই শিক্ষার্থীদের ৫ম বর্ষে গিয়ে সার্জারি করতে হয়, তারা যাতে সার্জারিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে, সে জন্য মরদেহে কাঁচি চালিয়ে তাদের সেই দক্ষতা অর্জন করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মৃত্যুর পর দেহদানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমাদের মৃত্যুর পর তো দেহ কোনো কাজে আসে না, কিন্তু দেহ দান করে গেলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়, আবার বিভিন্ন অংশ যেমন কিডনি, কর্নিয়া, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও লিভারের মতো বিভিন্ন অঙ্গ দান করে অন্য মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।’
মরদেহ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের এক অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘আমি নয় বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। প্রথম দিকে একজন ও চার বছর আগে আরেকজনের দান করা দেহ পেয়েছিলাম। এর মধ্যে প্রথম দেহটি কাজ করতে করতে ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দেহ দিয়ে অনেক কষ্ট করে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে হচ্ছে। যেহেতু এখন মরদেহ পাওয়াই যায় না, তাই শিক্ষার্থীদের সরাসরি মরদেহ নাড়তে না দিয়ে আমরা শিক্ষকরাই তা নাড়াচাড়া করি। আগে প্রচুর বেওয়ারিশ মৃতদেহ পাওয়া যেত, এখন তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করায় আমরা বেওয়ারিশ লাশও পাচ্ছি না। একটা লাশ পাওয়ার জন্য একবার আমি মর্গের সামনে ৩ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরপর নানা চেষ্টায় সেই লাশ পাই।’
মরদেহের সংকটের কারণে বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে হচ্ছে বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষক ডা. শাকিল শামস। তিনি বলেন, ‘অ্যানাটমির শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিভিন্ন কাটাছেঁড়া এবং গবেষণার জন্য একেকটি ব্যাচের জন্য একটি করে মরদেহের প্রয়োজন হয়, কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ নেই। তবে আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলছি। মেডিকেল শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সব দেশেই মানুষ মৃত্যুর পর দেহ দান করেন। আমাদের দেশে সামাজিক, পারিবারিকসহ বিভিন্ন কারণে মরণোত্তর দেহদানে মানুষের আগ্রহ কম। আবার যারা দান করে দিয়ে যান, মৃত্যুর পর তাদের পরিবার ও আত্মীয়দের বাধার কারণে সেই দেহ মেডিকেল পায় না। বেশি করে স্বেচ্ছায় মরণোত্তর দেহদান করলে মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষাগ্রহণ করতে পাববে, তাদের উপকার হবে এবং গবেষণাকাজে ব্যবহার করা যাবে।’
সম্প্রতি দেহদানে অঙ্গীকার করেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাহাতুল জান্নাত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে মুক্তি ও প্রগতির কথা বলেছি। নিয়মিত রক্ত দান করেছি, এখনো করছি। অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম মৃত্যুর পর দেহ মেডিকেলে দান করব। দেখেন আমার মৃত্যুর পর শরীরের কী হবে তা তো জানি না, কিন্তু এখন শান্ত্বনা পাচ্ছি আর যা-ই হোক মৃত্যুর পরও আমার শরীর মানবতার পক্ষে ভূমিকা রাখবে।’
এর বিপরীত চিত্র একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শহিদুলের। ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের বাধায় তিনি দেহদান করতে পারছেন না। শহিদুল বলেন, ‘আমার ইচ্ছে দেহ দান করার, কিন্তু স্ত্রী ও মেয়ে কোনোভাবেই এটা মানতে রাজি নয়। দেখি, তাদের বোঝাতে পারলে আমিও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য আমার দেহ আর অসুস্থ মানুষের জন্য আমার অঙ্গ দান করে দিয়ে যাব।’
এক দশক ধরে মরণোত্তর দেহদান-অঙ্গদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মৃত্যুঞ্জয়। সংগঠনটির সমন্বয়ক সাগর লোহানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের প্রচারণার ফলে এক হাজারের বেশি মানুষ মরণোত্তর দেহ কিংবা অঙ্গদানে অঙ্গীকার করেছেন। সামাজিকসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে মৃত্যুর পর মরদেহ দান বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করা নিয়ে দ্বিধা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তার পরিবারের কেউ আপত্তি করছে না, কিন্তু দূরের কোনো আত্মীয় এসে এটাকে ইস্যু করে ফেলছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত আর দেহ দান করা হয় না।’
একই সংগঠনের মিডিয়া সমন্বয়ক বৈশাখী রায় বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দেহদানে আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই নিবন্ধন করেছেন আবার কেউ কেউ আগামীতে করবেন। কিন্তু যেহেতু এই ইচ্ছুক মানুষের বয়স কম তাই দেহ দানকারীদের সংখ্যা বাড়ছে না। এরা যখন পরিণত বয়সে যাবে, মৃত্যু হবে, তখন দেহদানকারীর সংখ্যা বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যিনি দেহদানের অঙ্গীকার করেন, মৃত্যুর পর দেহটা তো হাসপাতালে হস্তান্তর করবে তার পরিবার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী বা স্বজনরা এমনভাবে কান্নাকাটি করে যে শেষ পর্যন্ত মরদেহ কবর দিয়ে দেয় কিংবা পুড়িয়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’
