রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর মূল কার্যক্রম জ্বালানি তেল পরিবহন করা, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন আয়ের প্রধান উৎস। কোম্পানিগুলোর অবকাঠামোও গড়ে উঠেছে সেভাবে। তবে তেল পরিবহন করে এসব কোম্পানি তেমন আয় করতে পারছে না। বরং গ্যাসকূপ থেকে প্রাপ্ত কমিশন ও অন্যান্য আয় দিয়ে পরিচালন মুনাফায় থাকতে হচ্ছে সরকারি এসব কোম্পানিকে। তারপরও এসব প্রতিষ্ঠান উচ্চ মুনাফার কোম্পানি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে বিপুল পরিমাণের সুদ আয়ের কারণে। পরিচালনা থেকে যে আয় আসে, তার প্রায় পাঁচগুণ বেশি আয় আসে আমানতের সুদ থেকে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চলতি তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই, ২৩-মার্চ, ২৪) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।
চলতি ২০২৩-২৪ হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করে পদ্মা অয়েল কোম্পানির নিট আয় হয়েছে ২০২ কোটি টাকা, যা অগের বছরের একই সময়ের চেয়ে সামান্য বেশি। এর বিপরীতে প্রশাসনিক, বিক্রি ও বিতরণ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা। এ সময় সুদ ব্যয় ও অবচয় বাবদ ৪১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ১৯৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এতে করে পরিচালন আয় হয়েছে মাত্র ৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের প্রথম ৯ মাসে ছিল ৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ সময় গ্যাসকূপের পণ্য হ্যান্ডলিং থেকে ১৯ কোটি ও অন্যান্য খাত থেকে ২২ কোটি টাকাসহ মোট অন্যান্য পরিচালন আয় এসেছে ৫০ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে করে চলতি হিসাববছরের ৯ মাসে মোট পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
তবে অনেক বছর ধরেই পদ্মা অয়েলের মূল আয় আসছে ব্যাংকে রাখা স্বল্প ও স্থায়ী আমানত থেকে। নিজেদের পুঞ্জীভূত মুনাফা স্থায়ী আমানত হিসেবে ব্যাংকে রাখে কোম্পানিটি। এর বাইরে প্যারেন্ট কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল বিক্রির টাকা স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন ব্যাংকে রেখে বিপুল পরিমাণের সুদ আয় পাচ্ছে কোম্পানিটি। ২০২২-২৩ হিসাববছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে পদ্মা অয়েলের ১ হাজার ৯০৩ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ছিল, যা থেকে সে সময় ১৪৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সুদ আয় হয়েছিল। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি আমানত (এসএনডি) ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা থেকে ১৮৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা সুদ আয় হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২০২২-২৩ হিসাববছরে ৩৭৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সুদ আয় হয় কোম্পানিটির।
গত বছর জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশে সুদ হার বাড়তে থাকায় পদ্মা অয়েল কোম্পানির আর্থিক আয়ও বাড়তে থাকে। এতে করে চলতি হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে স্বল্প ও স্থায়ী আমানত থেকে কোম্পানিটির সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ২৭১ কোটি টাকারও বেশি, যা কোম্পানির পরিচালন আয়ের প্রায় পাঁচগুণ। ২০২২-২৩ হিসাববছরের ৯ মাসে পদ্মা অয়েলের সুদ আয় ছিল ২৪৪ কোটি টাকা।
মুনাফায় কর্মীর হিস্যা ও কর পরিশোধের পর ৯ মাসে পদ্মা অয়েলের নিট মুনাফা হয়েছে ২৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি।
বিপিসির সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল পরিবহন করে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। ২০২২-২৩ হিসাববছরে বিতরণ করা মোট জ্বালানি তেলের ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ করে পদ্মা অয়েল। এ সময় তেল পরিবহনের দায়িত্বে থাকা অন্য দুই সরকারি কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল বিতরণ করে যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি তেল পরিবহন করেও পদ্মা অয়েলের নিট পরিচালন আয় মেঘনা পেট্রোলিয়ামের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ কম। আবার পদ্মা অয়েলে জনবলও অনেক বেশি। ২০২২-২৩ হিসাববছরে পদ্মা অয়েলে মোট জনবল ছিল ৮৭৯ জন, যেখানে মেঘনা পেট্রোলিয়ামে ছিল ৩৭৩ জন। কম জনবল নিয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আয়ও পদ্মা অয়েলের চেয়ে বেশি।
