টানা তিন মাস ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির পর হঠাৎ করেই বড় পতন হয়েছে। এপ্রিল মাস শেষে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। আগের মাসের তুলনায় কমেছে ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন বা ১১৮ কোটি ডলার বেশি।
তবে রপ্তানি আয়ে ছন্দপতন ঘটলেও প্রবাসী আয়ে উল্টো চিত্র। এপ্রিলের শেষ দিনের অস্বাভাবিক চিত্রে দুই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে প্রবাসী আয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেই দেশের রপ্তানি খাতে হঠাৎ পিছুটান দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি গত বছরের মতো এ বছরের পুরোটাই উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবই দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের টানা বন্ধ রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলেছে।
এপ্রিল মাসের রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগে গত ডিসেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল। এপ্রিলে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ কম। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত মোট রপ্তানি ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ৪৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া চলতি অর্থবছরে ১০ মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়ে ৪০ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিতে ৮৫ শতাংশ অবদান তৈরি পোশাক খাতের।
শেষ তিনদিনের প্রবাসী আয় নিয়ে প্রশ্ন
ঈদের আগে সাধারণত দেশের প্রবাসী আয় বেড়ে যায়। আর ঈদের পরে কিছুটা কমে। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পুরো উল্টো ঘটেছে। ঈদের আগের ১২ দিনে গড়ে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। আর ঈদের পর এপ্রিলের শেষ তিনদিন গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৯ কোটি ডলার। আর শুধু মাত্র শেষ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসের শেষ দিনে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিরা ২০৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার সমান ১১০ টাকা ধরে)। এ মাসে দৈনিক গড়ে এসেছে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৭৪৮ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, এপ্রিলের শেষ তিনদিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ৩৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ শেষ ৪ দিনে গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৯ কোটি ৫ লাখ ডলার করে। আর এপ্রিলের শেষ দিন রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ কোটি ডলারের বেশি। অথচ, ঈদের আগের ১২ দিনে দেশে এসেছিল ৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। সে হিসেবে প্রতিদিন এসেছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। মাসের শেষ দিন হঠাৎ করে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হককে একাধিকবার ফোন করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এপ্রিলে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, শরিয়াহভিত্তিক আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে।
এর আগে চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ২১০ কোটি বা ২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল ২১৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, মার্চে প্রায় দুই বিলিয়ন এবং এপ্রিলে এলো দুই বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। ২০২৩ সালের শেষ মাস ডিসেম্বরে এসেছিল ১৯৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স।
এর আগে ২০২০ সালে হুন্ডি বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২ হাজার ১৬১ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। এটি এ যাবৎকালের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে।
রপ্তানি খাত নিয়ে শঙ্কার কথা এডিবির
দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে সম্প্রতি আশঙ্কার কথা জানিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য কম। পুরো রপ্তানি খাত দিন দিন তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মোট রপ্তানির আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। দীর্ঘদিন ধরে পোশাক খাতকে ঢালাও সুবিধা দেওয়ার কারণেই রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ হয়নি।
এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে গেলে রপ্তানি পণ্যে যে শুল্ক আরোপিত হবে, তার জেরে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘এক্সপ্যান্ডিং অ্যান্ড ডাইভারসিফাইং এক্সপোর্টস ইন বাংলাদেশ : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক এডিবির এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে শুল্ক আরোপিত হলে বা বেড়ে গেলে তার জেরে রপ্তানি ৫ দশমিক ৫ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় দেশের রপ্তানির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মনে করে সংস্থাটি।
দেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য না আসার কারণ হিসেবে প্রণোদনা বৈষম্যের কথা উল্লেখ করেছে এডিবি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার সময়-সময় রপ্তানি খাতে যে প্রণোদনা দিয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি পোশাক খাতের জন্যই দেওয়া হয়েছে। শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা, আয়কর ছাড় বা রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলো সব খাতের জন্য প্রযোজ্য ছিল।
কিন্তু দেখা গেছে, এসব সুবিধার বেশির ভাগই মূলত তৈরি পোশাক খাত পেয়েছে। এই শিল্প ১৯৯০-এর দশকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা পেত; কিন্তু তখন তাদের নগদ সুবিধা দেওয়া হয়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
