গতবছর মিরপুর ১০ নম্বর শাহ আলী মার্কেটের পেছনে চায়ের দোকানে একজন তার বন্ধুর সঙ্গে চা পান করছিলেন রবিন। এ সময় তারা সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় পাশে বসে থাকা মাছুম নামের এক ব্যক্তি আগ বাড়িয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করে। মাছুম জানান, ভারতে তার ব্যবসা আছে এবং ওই প্রতিষ্ঠানে তিনি রবিনকে চাকরি দিতে পারবেন। এই প্রলোভনে তাকে ভারত নিয়ে জিম্মি করে একটি কিডনি নিয়ে নেয় চক্রটি। গতকাল রবিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন।
ডিএমপি জানায়, চায়ের দোকান থেকেই মাছুমের সঙ্গে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করেন রবিন। এরপর মাছুমের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো রবিনের। পরে মাছুম রবিনকে বলেন ভারতে তার প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য যেতে হলে ডাক্তারি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিনকে নিয়ে যান মাছুম। সেখানে চক্রের আরেক সদস্য রাজু হাওলাদারের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখানে রবিনের স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর তার পাসপোর্ট নিয়ে নেন ভারতের ভিসার জন্য।
ভিসা পাওয়ার পর রবিনকে মাছুম ও মো. রাজু হাওলাদার গ্রেপ্তার আসামি শাহেদ উদ্দিন (২২) ও মো. আতাহার হোসেন বাপ্পীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে রবিনকে ভারতের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে রিসিভ করেন পলাতক আসামি শাহীন (৩৫) ও সাগর। তারা রবিনকে রিসিভ করে তার পাসপোর্ট নিয়ে নেন। পরে দিল্লি থেকে ভিকটিমকে ফরিদাবাদ এলাকায় নিয়ে আটক রাখা অবস্থায় সেখানে মাছুম ও সাগর যান। মাছুমকে পেয়ে ভিকটিম তার চাকরির কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিভিন্ন রকম টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে আসামিরা ভুক্তভোগীর আর্থিক অনটন, সাংসারিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি কিডনি দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করেন। একপর্যায়ে ভয়ভীতি দেখান যে পাসপোর্ট ছাড়া তিনি দেশেও ফিরতে পারবেন না। পরে ভিকটিমকে নয়াদিল্লির এশিয়ান হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কিডনি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কিছুদিন পর ভারতের গুজরাটে নিয়ে যান এবং মুক্তিনগর এলাকায় দোতলা একটি বাসায় রাখেন।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে কাউকে কিছু না বলার শর্তে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গত ৪ মার্চ ভারতের গুজরাটে কিডনি অ্যান্ড স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে ভিকটিমের একটি কিডনি নিয়ে নেন। অপারেশন শেষে হাসপাতাল থেকে চার দিন পরে ছাড়া পান ভিকটিম। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আসামিরা ভারতের অজ্ঞাত স্থানে প্রায় ১০-১১ দিন আটকে রাখেন তাকে।
এদিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন মাধ্যমে ভিকটিম জানতে পারেন, তার কিডনি আসামিরা দালাল চক্রের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। একপর্যায়ে দালাল চক্র ভিকটিমকে কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলে। বাংলাদেশে অবস্থান করা চক্রের অন্য সদস্যরা ভিকটিমের স্ত্রী ইশরাত জাহানের বিকাশ নম্বরে ৩ লাখ টাকা দেন। পরে এভাবে দেশে এসে ভিকটিম বুঝতে পারেন যে তিনি বড় দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিজের কিডনি হারিয়েছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী রবিন জানান, প্রায় তিন মাস ভারত থাকার পর গত ১৯ মার্চ তিনি দেশে ফেরেন। চক্রের ভারতের এক সদস্য বিমানের টিকিট সংগ্রহ করে দিয়েছিল তাঁকে। কিডনির বিনিময়ে ছয় লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত চক্রটি তিন লাখ টাকা দিয়েছে। বাকি টাকা দিচ্ছে না। তিনি জানতেন বেশ কিছু মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কিডনি পাচার চক্রের সদস্যরা সক্রিয়। ভারতে থাকার সময় ওই গ্রুপে তাকে যুক্ত করা হয়। দেশে ফিরে যখন ওই মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিন লাখ টাকা চাওয়া হয়, তখন রবিনকে গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়। উপায় না দেখে বাসার ফ্রিজ, টিভিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র বিক্রি করে এপ্রিলে ফের দিল্লি যান রবিন। পুরোনো ঠিকানায় কিডনি বিক্রি চক্রের সদস্যদের খুঁজতে থাকেন। তবে পুরোনো জায়গা থেকে একজন বাদে সবাই গা-ঢাকা দেয়।
দেশে ফিরে রবিন তাঁর কয়েক বন্ধুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে নতুন একটি সিম কার্ড তোলেন। এরপর ওই ফোনের মাধ্যমে কিডনি কেনাবেচা চক্রের মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছদ্মবেশে যোগাযোগ শুরু করেন। একজন কিডনি বিক্রি করতে চান– এটি ওদের জানানো হয়েছিল। মেসেঞ্জারে তারা ইতিবাচক সাড়া দেয়। মোটা অঙ্কের টাকায় ওই ব্যক্তির কিডনি তারা কেনার আগ্রহ দেখায়। এরপর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালের সামনে দেখা করতে চায় প্রতারক চক্রের সদস্যরা। পুরো বিষয়টি আগেই পুলিশকে জানিয়ে রাখেন রবিন। এরপর ভেক ধরে রবিনের সঙ্গে দেখা করতে এলেই ধানমন্ডি থানা পুলিশের কাছে ধরা খায় তারা। এর সূত্র ধরে বাগেরহাটেও অভিযান চালায় পুলিশ। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। তারা হলো রাজু হাওলাদার (৩২), শাহেদ উদ্দীন (২২) ও আতাহার হোসেন বাপ্পী (২৮)।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) ড. খ. মহিদ উদ্দিন জানান, চক্রটি নিম্ন আয়ের মানুষকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে ভারতে নিয়ে যায়। পরে পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এক পর্যায়ে হাসপাতালে নিয়ে কিডনি বিক্রি করে দেয়। চক্রটি এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জনকে ভারতে নিয়ে কিডনি বিক্রি করেছে। পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশকেন্দ্রিক কিডনি কেনাবেচার এ চক্রের সদস্যরা ভারতের দিল্লি, গুজরাট, কলকাতা ও রাজস্থানে সক্রিয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের হয়ে কাজ করে এমন দালালও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আছে কিছু গ্রুপ।
