দেশের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, ফাঁসির দণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তিদের রাখা হয় কারাগারের বিশেষ সেলে, যা কনডেম সেল নামে পরিচিত। কারাগারগুলোর কয়েক ফুট দৈর্ঘ-প্রস্থের এই সেলকে অনেকেই বলেন, ‘মৃত্যু সেল।’ আপিল আবেদন নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাজা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সর্বোচ্চ সাজার আসামিকে এই সেলে রাখা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে দীর্ঘ দিন ধরে। অবশেষে উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত এসেছে এ বিষয়ে। হাইকোর্ট বলেছে, মৃত্যুদণ্ড পাওয়াদের অন্য বন্দির মতো একই দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সর্বোচ্চ সাজা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কাউকে এই সেলে রাখা যাবে না।
আদালত আরও বলেছে, কনডেম সেলে কোনো আসামিকে রাখা দুইবার সাজার শামিল। আদালত কারা কর্র্তৃপক্ষকে দুই বছরের সময় দিয়ে বলেছে, এই সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আসামিদের ফাঁসির সেল থেকে সাধারণ সেলে রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে কারা কর্র্তৃপক্ষ।
দুই বছরের বেশি সময় আগের এ-সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে গতকাল সোমবার এ রায় দিয়েছে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। কনডেম সেলে থাকা তিন আসামির করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় আগে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্তের আগেই বিশেষ এই সেলে রাখার বৈধতা নিয়ে রুল দেয়। গতকাল রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শেষে এ রায় হলো। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ মে পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোর বিশেষ সেলে আড়াই হাজারের বেশি ফাঁসির আসামি বন্দি আছেন। হাইকোর্টের এই রায়কে যুগান্তকারী ও ইতিবাচক উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি ব্রিটিশ মানসিকতার আইন ও ধারণা থেকে আধুনিক বিচারব্যবস্থার পথে উত্তরণের একটি প্রাথমিক ধাপ।
যে প্রক্রিয়ায় কনডেম সেল জীবন : ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তাকে পাঠানো হয় কারাগারের বিশেষ সেলে। এটি কনডেম সেল হিসেবে পরিচিত। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধি ও কারাবিধিতে (জেল কোড) কনডেম সেল শব্দচয়ন নিয়ে কিছু বলা নেই। তবে, ব্রিটিশ আমল থেকে নির্জন ও পৃথক এই সেলগুলো কনডেম সেল হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর করতে হাইকোর্টে শুনানি এবং অনুমোদন নিতে হয়। এ জন্য ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) পাঠানো হয় হাইকোর্টে। পাশাপাশি সেলে থাকা বন্দিরা মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিলের সুযোগ পান। হাইকোর্টে সাজা বহাল থাকলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ রয়েছে বন্দিদের। আপিল বিভাগে সাজা বহাল থাকলে রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করতে পারেন আসামি। রিভিউয়ে শুনানি শেষে রায় বহাল থাকলে শেষ সুযোগ হিসেবে দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি। যদি সেই আবেদনও নাকচ হয় তাহলে কারা কর্র্তৃপক্ষ কারাবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে ফাঁসি কার্যকর করে। বিচারিক আদালতে ফাঁসির রায়ের পর উচ্চ আদালতে যত দিন মামলা নিষ্পত্তি না হয়, তত দিন পর্যন্ত বন্দিকে থাকতে হয় কারাগারের বিশেষ সেলে। এ ক্ষেত্রে সময় লাগে সর্বনিম্ন ৬ বছর। হাইকোর্টে এখন ২০১৮ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার এ বিষয়টি গতকাল হাইকোর্টের রায়েও উঠে এসেছে। আদালত বলেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ১৫-২০ বছর লেগে যায়।
রায়ে যা বলা হয়েছে : হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি, কনডেম সেল নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনায় আদালত বলেছে, ‘কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগ এবং রিভিউর (রায় পুনর্বিবেচনা) পরও বহাল থাকলে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আবেদন নাকচ হয়ে গেলেই কেবল মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত বলে ধরে নিতে হবে এবং তখন থেকে দ-িত ব্যক্তিকে ওই বিশেষ সেলে রাখা যাবে।’ সর্বোচ্চ এই দণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে ইতিমধ্যে যাদের কনডেম সেলে রাখা হয়েছে, তাদের দুই বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সাধারণ সেলে স্থানান্তর করতে হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। তবে শর্ত হিসেবে বিশেষ ক্ষেত্রে দণ্ডিত কোনো আসামি যদি কোনো সংক্রামক ব্যধিতে আক্রান্ত হন এবং তাকে অন্যদের সঙ্গে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে, সেই ব্যক্তিকে কনডেম সেলে রাখা যাবে ওই ব্যক্তির বক্তব্য শুনে। রায়ে আরও বলা হয়, ‘আইনে মৃত্যুদণ্ড একধরনের শাস্তি। কাজেই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর কাউকে কনডেম সেলে রাখা দুইবার সাজার সমতুল্য।’ আদালত আরও বলে, এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জামিনের আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ হয় না। আসামির আপিল চলমান থাকাবস্থায় জামিনের আবেদন ও শুনানির সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ ছাড়া হাইকোর্ট বলেছে, কারাবিধি সংস্কারের লক্ষ্যে যে কাজ চলছে তাতে হাইকোর্টের এই রায়ের নির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ ও অভিমতের প্রতিফলন যেন থাকে।
মৃত্যুর প্রহর গুনছে আড়াই হাজার বন্দি : কারাগারের বিশেষ সেলে আড়াই হাজারের বেশি ফাঁসির আসামি মৃত্যুর দিন গুনছেন। এ সংখ্যা এখন দেশের কারাগারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৮টি কারাগারের ফাঁসির সেলগুলোতে বন্দির সংখ্যা ২ হাজার ৫১৫। এর মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪২৯ জন। ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত যে ৮৬ নারী রয়েছেন, তাদের সংখ্যাটাও কারা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আড়াই হাজারের বেশি এসব আসামির মধ্যে হাইকোর্টে বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছেন ১ হাজার ১৯৫ জন। আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হবে ১ হাজার ৩২০ জনের আপিল।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোসহ পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজা বেশি হয়, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। কৃত অপরাধে এই দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিয়ে দেশে-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে। বেশিরভাগ দেশ হয় এই কঠোর সাজা তুলে নিয়েছে কিংবা রহিত করেছে। তবে, বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ড দেশপ্রবণ দেশগুলোর একটি হলেও সাজা কার্যকর হয় কম। বিচারিক আদালতের বেশিরভাগ ফাঁসির সাজা হাইকোর্টে শুনানির পর রহিত হয়ে যাবজ্জীবন, খালাস বা অন্য মেয়াদের সাজা হয়। মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেন, ডেথ রেফারেন্সের মতো স্পর্শকাতর মামলা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হওয়ার দরুন বছরের পর বছর ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও তার পরিবার মানসিক, শারীরিক ও আর্থিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজে।
এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চূড়ান্ত বিচারে কনডেম সেলে থাকা আসামিদের অনেকের সাজা বহাল থাকতে পারে। খালাসও পেতে পারেন অনেকে। আবার কারও সাজা কমতেও পারে। কথা হলো, বিচারের অপেক্ষায় বছরের পর বছর এভাবে জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা সমর্থনযোগ্য নয়। নির্জন সেলে মৃত্যুর দিন গোনা অমানবিক।’
হাইকোর্টের রায়কে যুগান্তকারী উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিষ্ঠুরতা নয় এ প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। এই রায় প্রগতি ও ব্রিটিশ আমলের আইন এবং ধারণা থেকে উত্তরণের একটি ধাপ।’
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, হাইকোর্টে বিচারক স্বল্পতার কারণে ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ কম। ফলে মামলা বাড়ছে। বিচারে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। অন্যদিকে ফাঁসির আসামিদের মামলা আসে ক্রম অনুযায়ী। তাই বিশেষ কিছু মামলা (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে) ছাড়া এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আসলে বিশেষ কিছু করণীয় নেই। কার্যতালিকায় যখনই মামলা আসবে, তখন তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গতকালের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলব। সরকার সিদ্ধান্ত দিলে আপিল করা হবে।’
যেভাবে এলো হাইকোর্টের রায় : মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্তের আগেই কনডেম সেলে রাখার বৈধতা নিয়ে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত হয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে থাকা সাতকানিয়ার জিল্লুর রহমান, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা সুনামগঞ্জের আব্দুল বশির ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা খাগড়াছড়ির শাহ আলমের পক্ষে ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। পরের বছর ৫ এপ্রিল হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে কনডেম সেলে রাখা কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল দেয়। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের কনডেম সেলে রাখা-সংক্রান্ত জেল কোডের ৯৮০ বিধি কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না রুলে তাও জানতে চায় হাইকোর্ট। গত বছর নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রুলের ওপর শুনানি শুরু হয়। মামলাটিতে হাইকোর্ট অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহান ও প্রবীর নিয়োগীর মতামত ও ব্যাখ্যা শোনে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রুলের ওপর শুনানি শেষে রায় যে কোনো দিন ঘোষণা করা বলে বলে তা অপেক্ষমাণ রাখে আদালত। রিটকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই রায় দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মাইলফলক। কারা কর্র্তৃপক্ষ দুই বছর সময় পাচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
