মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৬:৪০ এএম

দেশের খাদ্য উৎপাদন এপ্রিল মাসেই রেকর্ড ছাড়িয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও ভোক্তার লাভের চেয়ে ক্ষতির অঙ্কই বেশি। এপ্রিল মাসে গড় মূল্যস্ফীতি মার্চের তুলনায় কিছুটা কমলেও, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ফের ২ অঙ্ক ছাড়িয়ে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে ঠেকেছে।

গতকাল সোমবার মাসিক ভোক্তামূল্য সূচকের তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এই প্রতিবেদনে দেশের মূল্যস্ফীতির চিত্র উঠে এসেছে।

বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য বলছে, এপ্রিলে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা, তার ধারেকাছেও রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার যে ঘোষণা দিয়েছিল, তাও সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক পদক্ষেপ সঠিক সময়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে, বেশি মূল্যে খাদ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারা বিশ্বে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল, তখন প্রায় সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। এতে করে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই সফল হয়। তবে বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেখা মিললেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বরং ঋণের সুদহারে ঊর্ধ্বসীমা ৯ শতাংশ বহাল রাখে। যদিও দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা আমলে নেয়নি। প্রায় সব দেশ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা পেতে শুরু করে, তখনো বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় আমদানি সীমিত করে আনে। এতে করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘসময় ধরে বহাল রয়েছে। অবশ্য পরে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে সুদহার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যদিও সেটি অনেক বিলম্বিত পদক্ষেপ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।  

এরপর থেকেই ১১ মাস ধরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদহার বাড়িয়েই চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু বেলাশেষে কোনো কাজেই আসছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। সঠিক সময়ে সুদহার বৃদ্ধি করতে না পারায় এখন তার কোনো সুফল মিলছে না। ভোক্তাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন ব্যর্থতাকে বলা যায় সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।

মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ বলতে বোঝায় ২০২৩ সালের এপ্রিলে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা সম্ভব হয়েছিল, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তা কিনতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৭৪ পয়সায়।

জানুয়ারিতে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানিয়েছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি তৈরি করা হয়েছে। নতুন এই মুদ্রানীতির মাধ্যমে জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে এবং বছর শেষে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করেছিলেন তিনি।

এর আগে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। হাতে আর মাত্র দেড় মাস রয়েছে। যে কাজ ১১ মাসেও করতে পারেনি, তা মাত্র দেড় মাসে করে ফেলবে এমন প্রত্যাশা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে কেউই আশা করতে পারছেন না।

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ড. গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি কথা আছে সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। যে সময় সারা দুনিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, বাংলাদেশে সে সময় তা তো নেয়ইনি, বরং উল্টোপথে হেঁটেছে। সে কারণেই এখন অনেক কষ্ট হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কাজই অর্ধেক বাকি।

তিনি বলেন, কদিন আগে সুদের হার বাজারভিত্তিক করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব উদ্যোগ যদি অব্যাহত রাখে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৃত্রিমভাবে সরকারকে আর যদি টাকা সরবরাহ না করে, তাহলে আস্তে আস্তে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে, তবে এটি কয়েক মাস সময় লাগবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ শুধু সুদহার বাড়ানোই নয়, নিত্যপণ্যের বাজারে অব্যাহত নজরদারি রাখাও তার কাজ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু সুদহার বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন দিয়েই তাদের কাজ শেষ করছে তারা।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী উদাহরণ তৈরি করেছিল শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের মূল্যস্ফীতি যখন ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তখন সুদহার বাড়িয়েই বসে থাকেননি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। খুচরা বাজার থেকে শুরু করে পাইকারি বাজারের প্রত্যেকটি পণ্যে নজরদারি করেছিলেন তিনি। প্রতিদিনের পণ্যমূল্য শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পাওয়া যেত, যা এখনো অব্যাহত আছে। এত চমৎকার উদাহরণ পাশের দেশে থাকতেও বাংলাদেশ ব্যাংক তার পুরনো নীতিতেই চলছে। খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে।

সরকারি হিসাবে গত মাসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি ছিল খাদ্যপণ্য কেনায়। বিবিএস বলছে, এপ্রিলে খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ২২ শতাংশ। যেটি এক মাস আগেও ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গ্রাম ও শহরাঞ্চল, উভয় স্থানেই দেশের খাদ্যপণ্যের দাম ছিল ১০ শতাংশের বেশি।

খাদ্যপণ্য সীমার বাইরে থাকলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ছিল কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। এপ্রিলে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

গত মাসে আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ নিয়ে জরিপে বলেছিল এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের খাদ্যসংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সরকারের প্রকাশিত ভোক্তামূল্য সূচকেও একই চিত্র উঠে এসেছে। অর্থাৎ আগামী মাসগুলোতে দেশের খাদ্যসংকট আরও বাড়ছে।

এদিকে ডলারের দাম এক লাফে সাত টাকা বাড়ানোর ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তথ্য বলছে, এপ্রিলে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। এ মাসে গ্রামের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। গ্রামের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ, মার্চে তা ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

শহরে এ সময় গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ, মার্চে যা ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এপ্রিলে ব্যাপক হারে বেড়েছে স্বাস্থ্য ব্যয় এ মাসে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে স্বাস্থ্য ব্যয়। মার্চ মাসে স্বাস্থ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ, এপ্রিলে তা এক লাফে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এক লাফে কোনো খাতের পণ্যে এত মূল্যস্ফীতি এ মাসে হয়নি।

স্বাস্থ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশের অর্থ হলো, ২০২৩ সালের এপ্রিলে যে স্বাস্থ্যপণ্য কিনতে হয়েছে গড়ে ১০০ টাকায়, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তা কিনতে হয়েছে গড়ে ১১৩ টাকা ৬৯ পয়সায়।

ভোক্তামূল্য সূচকের খাতভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতেও স্বাস্থ্য খাতের মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ১৪ শতাংশ, মার্চে তা কিছুটা বেড়ে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু এপ্রিলে এসে তা এক লাফে ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে ঠেকেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত