মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হাজার টাকায় বিক্রি ভোটের ডিউটি

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৬:৩১ এএম

কুষ্টিয়ায় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপুল টাকার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা আনসার কর্মকর্তা ও ভিডিপির দলনেতাদের দিয়ে সিন্ডিকেট করে সাধারণ আনসার সদস্যদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলার সংশ্লিষ্ট আনসার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয় এমন ব্যক্তিদেরও জাল সনদ দিয়ে ভিডিপি (ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি) সদস্য হিসেবে নির্বাচনী দায়িত্বের তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য তালিকাভুক্ত করতে ভিডিপি সদস্যদের কাছ থেকে মাথাপিছু ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম জমা নেওয়া হয়। গত বছরের শেষে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচশোর বেশি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে ১৫-২০ জন করে প্রায় ১০ হাজার ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া জেলার দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এবং ২১ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আরও চারটি উপজেলার নির্বাচনে পাঁচশোর বেশি ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রায় ১০ হাজার ভিডিপি সদস্য মোতায়েনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। সে হিসাবে এই দুই নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়াদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা আনসার কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য ভিডিপি সদস্যদের এক দিনের কর্মশালাসহ ছয় দিনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতি এক দিনের জন্য তারা ১ হাজার টাকা ভাতা পান।

৭ মে দুপুরে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চত্বরে নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ ও কর্মস্থল বুঝে নিতে আসা আনসার সদস্য আব্দুল বারেকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘পিসি (প্লাটুন কমান্ডার) এপিসির (অ্যাসিসট্যান্ট প্লাটুন কমান্ডার) মাধ্যমে নির্ধারিত টাকা অগ্রিম দিয়ে নাম তালিকাভুক্তি কনফার্ম করতে হয়েছে। সংগৃহীত এসব টাকা আনসার অফিসের বিশ্বস্ত ভাতাভোগী পাঁচ আনসার সদস্য জেসমিন, ঈশিতা, আবুল কালাম, সাইদুর রহমান ও মাসুম বিল্লাহ এবং উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে বড় কর্মকর্তাদের কাছে চলে যায়।’

নাম তালিকাভুক্তির জন্য টাকা দিতে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সদর উপজেলার উজানগ্রামের বাসিন্দা ভিডিপি সদস্য রুবিনা খাতুন বলেন, ‘একেনে দ্যাকেন প্রায় আদাআদি (অর্ধেক) নারীরা আনসারের ডিউটি কত্তি আইচে, ইরা সবাই খুব অভাবী সংসারের, এই এক-দুই দিন ডিউটি কইরি যদি কিচু টেকা আসে তালি তো সুংসারে ইকটু আয়-বরকত হয়। সে জন্যিই সবাই আসে। কত ক্যাম্মা কী দিবিনি একনও বুলিনি। দেখি কয় টেকা দেয়। আগেই তো পোনেরোশো টেকা দিয়ে নাম লেকাতি হইচে। এডি বন্ধ হওয়া দরকার, কাম করব আমি, কষ্ট করব আমি, সেই টেকার ভাগ অন্য লোকেক দিতি হবি ক্যা? ’

একইদিন সদর উপজেলা চত্বরে কথা হয় টাকা আদায়ে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ভাতাভোগী আনসার সদস্যা ঈশিতা খাতুনের সঙ্গে। তবে তিনি টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণের সনদ জালিয়াতি এবং নাম তালিকাভুক্তির জন্য টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। ঈশিতা খাতুন বলেন, ‘এখানে আমার কোনো কাজ না, আমাদের মোস্তাফিজ স্যারের কিছু কাজ আমি করে দিচ্ছি মাত্র। আমি যে কাজ করছি সেই কাজ পাঁচজন ভাতাভোগী আনসার সদস্যকে দিয়ে স্যারেরা করান।’ এ সময় আরেক আনসার সদস্য জেসমিন আক্তারও একই ধরনের কথা বলেন। তবে টাকা আদায়ে জড়িত অপর তিন আনসার সদস্য গা ঢাকা দেন সদর উপজেলা চত্বরে সমবেত তিন হাজার ভিডিপি সদস্যের ভিড়ে।

টাকা নিয়ে নাম তালিকাভুক্তির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এসব অভিযোগ বানোয়াট ও মিথ্যা। যারা ডিউটি না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছে, তারাই এ ধরনের উল্টাপাল্টা অভিযোগ দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

আর আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী কুষ্টিয়ার জেলা কমান্ড্যান্ট প্রদীপ চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘বিধিবহির্ভূত কোনো কাজ করার সুযোগ আনসারে নেই। আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিউটি শেষে প্রত্যেকের রকেট নম্বরে প্রাপ্য টাকা চলে যায়। এ ধরনের শোনা কথার অভিযোগ আমার কানেও এসেছে। তবে এ বিষয়ে আমি কারও কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তি যে-ই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত