মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিটিভিতে আগের সেই মানুষ নেই

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

সুপরিচিত নাট্যব্যক্তিত্ব। একজন মুক্তিযোদ্ধা। মঞ্চনাট্যদল নাট্যচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের জনপ্রিয় মুখ ম. হামিদ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) যার পদচারণা দীর্ঘ সময়। বিটিভির অনুষ্ঠান প্রযোজক থেকে হয়েছিলেন মহাপরিচালক। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সেই তিনিই আড্ডার শিরোমণি। আড্ডাবাজ সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক মাহতাব হোসেন এবং ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন নুরুস সাফা।  

অফিসে আসার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টায়। বাসা পায়ে হাঁটা পথ। কিন্তু জরুরি কাজে ছিলেন উত্তরা। সেখান থেকে আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। এমন সময় এলেন, তখন রাত প্রায় ৮টা। নিউজরুম গমগমে। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর তার। তবু মুখে হাসি। কিছুক্ষণ আড্ডা হলো ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে। রাত বাড়তে থাকে। এরপর অফিসে ছবি তোলা হলো। পরদিন আবার বাসায়। তিনি বললেন, চলো চলো...। এরপর কিছুক্ষণ এলোমেলো কথা বলা। যে যার মতো। কখনো হাসি, কখনো বিষণœতা। পরনে শুভ্র শার্ট। চোখ বড় করে, হাসিমুখে চেয়ে আছেন ক্যামেরার দিকে। কী যে তীক্ষ চাহনি তার! এরপর ক্যামেরা রোলিং। সূচনা বক্তব্য দিলেন তাপস রায়হান। ম. হামিদ মুচকি মুচকি হাসছেন। প্রথমেই প্রশ্ন করা হলো

তাপস রায়হান : আপনি কোন পরিস্থিতিতে ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক হলেন? এর আগে জানতে চাইছি, কোথায় পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন?

ম. হামিদ :  (হাসতে হাসতে) আমি আসলে বিভিন্ন জেলার ৮টি স্কুলে পড়াশোনা করেছি। কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ এই চার জেলাতেই বিভিন্ন স্কুলে পড়েছি। এ রকম হয়েছে আসলে আব্বার চাকরির জন্য। কুমিল্লার ২টি স্কুল, ময়মনসিংহে ৩টি স্কুলে, মুক্তাগাছায় পড়েছি, যশোর এবং খুলনায়। আব্বা তো সরকারি চাকরি করতেন। তিনি এগ্রিকালচারাল ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে ছিলেন। (এরপর আবার হাসি)। ইন্টারমিডিয়েটও ২টি কলেজে পড়েছি। জগন্নাথ কলেজে ফার্স্ট ইয়ার এবং জগন্নাথ কলেজে সেকেন্ড ইয়ার। আবার ডিগ্রি পড়েছি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। সেখানে ফার্স্ট ইয়ার, এরপর জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজে সেকেন্ড ইয়ার। হাহাহাহা। তারপর জগন্নাথ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছি।

সাহাদাত পারভেজ : এ রকম কেন হলো!

ম. হামিদ : এটার কারণ আলাদা। সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন করার কারণে আমাকে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। তখন যাই জামালপুরে। সেখান থেকে জগন্নাথে। ওখানেই কল্যাণ মিত্রের লেখা ‘সূর্যমহল’ নাটকে প্রথম অভিনয় করি।

সাহাদাত পারভেজ : নাটকের পোকা সেখান থেকেই ঢুকল?

ম. হামিদ : ঠিক তা না। এটা হয়েছে আসলে পারিবারিকভাবে। আমার মামারা ছিলেন খুবই সংস্কৃতিপ্রেমিক। ওখান থেকেই আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়লাম নাটকের সঙ্গে। একসময় তো চলচ্চিত্রে ডাক পড়ল। ৩টি চলচ্চিত্রে কাজ করব, এমন চুক্তিও হয়েছিল। এর মধ্যে তো ‘জয় বাংলা’ ছবির নায়িকা আতিয়ার সঙ্গে স্টিল ছবিও পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেছে। আবার ‘অগ্নিকন্যা’ ছবিতেও কাজ শুরু হবে। নায়িকা ছিলেন কবরী। চিত্রালীতে ছবি ছাপা হলো। ওটাও হলো না। এর মধ্যে তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তখন আর চলচ্চিত্রে যাওয়ার আগ্রহ থাকল না। আমি তো চলে গেলাম যুদ্ধে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলল, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম।

সাহাদাত পারভেজ : আপনি তো শেখ কামালের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। শেখ কামাল সম্পর্কে অনেক আজেবাজে কথা রটানো হয়েছে। আসলে সে তো অত্যন্ত অন্যরকম মানুষ ছিলেন?

ম. হামিদ : আমরা স্বাধীনতার পর যখন ফিরলাম, তখন আমি ডাকসুর

সাংস্কৃতিক সম্পাদক। গঠিত হলো নাট্যদল ‘নাট্যচক্র’। আমরা প্রথম নাটক মঞ্চায়ন করলাম ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখে। মাত্র ১ মাস ১২ দিনের মাথায় আমরা ২টি নাটক করলাম। কামাল ওই সময়েই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। আমরা আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতা শুরু করলাম ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে। ও নাটকে অভিনয় করল। কামাল ছিল সলিমুল্লাহ হলে। আমি ছিলাম মুহসিনে। সলিমুল্লাহ হলের নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করল শেখ কামাল। ওর অভিনয় দক্ষতা, কণ্ঠের কাজ ছিল অসাধারণ। অসম্ভব মেধাবী এবং প্রখর স্মরণশক্তি ছিল ওর। ওকে তৈরি করতে হতো না। মনে হতো ও তৈরি শিল্পী। কামালের মধ্যে গণতান্ত্রিক যে বোধ ছিল তা অসাধারণ। শিল্পের মধ্যে যে ঔদার্য থাকতে হয় সেটা ওর ছিল। যা শোনা যায় কামাল সম্পর্কে, সেটা একেবারেই উল্টো ঘটনা। এসব রাজনৈতিক কুৎসা।

মাহতাব হোসেন : এই যে কুৎসা ছড়ানো হলো, এর উৎস কী?

ম. হামিদ : আসলে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কম মানুষ তো কাজ করেনি। স্বাধীনতাবিরোধীরা তো স্বাধীনতার পরও দেশে টিকেছিল। ওরাই এসব রটনা করেছে। ’৭২ সালেই কিন্তু ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে যায়। একটা মুজিববাদী ছাত্রলীগ, আরেকটা বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক ছাত্রলীগ। তুলনামূলকভাবে জাসদ ছাত্রলীগে মেধাবী ছেলেরা চলে যায়। আর বঙ্গবন্ধু অনুসারীরা এখানে থেকে গেল। পরবর্তী সময়ে জাসদ ছাত্রলীগ কী হয়েছে আমরা জানি। রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কী ছিল সেটাও জানি। ওই পক্ষই শেখ কামালের বিরুদ্ধে লেগেছিল। ভাসানী-ন্যাপের একটা পত্রিকা ছিল হক কথা। সেখানে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ কামাল সম্পর্কে অনেক উল্টাপাল্টা কথা লেখা হতো।   

কামাল-খুকু দুজনই সোসিওলজিতে পড়ত।

ওর সম্পর্কে যা বলা হতো, নারীদের সম্পর্কে নাকি খুব বিদ্বেষী ছিল, ত্রাস ছিল! এটা একেবারেই ডাহা মিথ্য কথা, অসম্ভব। আমি জোর দিয়েই এই কথা বলছি। মেয়েদের যে সম্মান ও নিরাপত্তা দিত, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা ছিল মুগ্ধতা ছড়ানো। আমাদের নাটকের রিহার্সেলের পরে একটু রাত হয়ে গেলে, কাউকে বলা হতো তাদের বাসায় পৌঁছে দিতে। অনেককেই সে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। বুলবুল মহলানবীশ, ডলি জহুরসহ অনেককেই পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না, কারও প্রতি কোনোরকম অশালীন বা বাজে মন্তব্য করেছে। যারা বলে, তারা শুধু মিথ্যবাদী না কুচক্রী। নোংরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বলে। এই যে ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে একটা ঘটনা প্রচলিত রয়েছে, সেটা একটা গল্প। একটা কল্পনার গল্প তৈরি করা হয়েছে। আসলে ঘটনাটা কী ছিল? তখন সর্বহারারা দেশের অনেক জায়গায় অরাজকতা চালাচ্ছে। কোথাও থানা লুট করছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের আক্রমণ করছে। পুলিশের কাছে এবং সরকারের কাছেও খবর ছিল শহরের ভেতরে ওরা একটা এ রকম নাশকতা করবে। সেটা দিনক্ষণসহ জানতে পেরেছিল। এত তারিখ এই সময়ের মধ্যে। এটা কামালও জানতে পেরেছে। কামাল ছিল একটু দুরন্ত, সাহসী, অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করত। সে ঠিক করল, বন্ধুবান্ধব নিয়ে যথাসময়ে তাদের চ্যালেঞ্জ করবে। গাড়ি নিয়ে বের হলো। দেখল একটা মাইক্রোবাসের গতি সন্দেহজনক। ওরা সেটা ফলো করতে থাকল। মাইক্রোবাসও অগ্রসর হচ্ছে, ওরাও হচ্ছে। আসলে মাইক্রেবাসের ভেতরে ছিল পুলিশের লোক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে জসীম উদ্দীন রোডে ছিল ডিবি অফিস। ওরা সেখান ঢুকে গেছে। আর পুলিশ ভেবেছে, ওরা সর্বহারা। ওদের তাড়া করছে। আর এরা ভাবছে ওরা বুঝি সর্বহারা। অফিসে ঢোকার পর ওরা গুলি শুরু করল। তখন শেখ কামাল চিৎকার করে বলল আমি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে শেখ কামাল। এরই মধ্যে কামালসহ কয়েকজন আহত হয়েছে। পুলিশ বুঝতে পারার পর সব থেমে যায়। এরপর ওকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ কামালকে হাসপাতালে দেখতে গেলেন। কিন্তু সেই পুলিশ সার্জেন্ট তো ভয়ে অস্থির। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ক্রসফায়ারে আহত হয়েছে, আর তো রক্ষা নেই! অথচ বঙ্গবন্ধু তাকে কিছুই বলেননি। তার কিছুই হয়নি। এই ঘটনাটাই কীভাবে প্রচার করা হয়েছে তা আমরা জানি। তখন মানুষকে কোনো গল্প দিলেই গোগ্রাসে খেতো।

সাহাদাত পারভেজ : বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর তো একটা বিশাল শূন্যতাও তৈরি হয়েছিল?

ম. হামিদ : এটা অনেক বড় আলোচনা। নাটকের কথা বলি। আমার নির্দেশনার দুটো নাটকে কামাল অভিনয় করেছে। একটা হলো ম্যাক্সিম গোর্কির ‘দানব’। আরেকটা দ্বিজেন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’। প্রথমটা হয়েছে ’৭৩ সালে আর পরেরটা ’৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

সাহাদাত পারভেজ : আপনার যে ছবিটা দেখি, সেটা কি বাংলা একাডেমিতে?

ম. হামিদ : হ্যাঁ। নবান্ন নাটকে।

সাহাদাত পারভেজ : শেখ কামাল সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। নাটক করতেন, গান শিখতেন, আবাহনীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। আরও অনেক কিছু। এত সময় কীভাবে পেতেন?

ম. হামিদ : সবাই শেখ কামাল হয় না। বহু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির পুত্র থাকে কিন্তু শেখ কামাল না। এটি ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত মেধা। আড্ডা সে যেভাবে জমিয়ে রাখতে পারত, তোমরা ভাবতেও পারবে না। কত রকম যে রসিকতা করতে পারত! সকালে সে ইউনিভার্সিটিতে আসছে, ক্লাস করছে, আড্ডা দিচ্ছে। কখনো বারান্দা, কখনো সিঁড়িতে বসে গল্প করতাম। দুপুরে চলে যেত বাসায়। সেখানে খাওয়াদাওয়া করে চলে যেত মাঠে। মাঠের কাজ শেষ করে আসত নাটকের রিহার্সালে। রিহার্সাল শেষ করে যেত গানের আসরে। তারপর আবাহনীতে। এভাবেই ছুটে চলা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা।

সাহাদাত পারভেজ : আবার তো খুকী ভাবিকেও সময় দিতে হতো? তিনিও তো আপনার পরিচিত ছিলেন?

ম. হামিদ :  আহা, ও যে কী সুন্দর ছিল! কী যে প্রাণবন্ত! কী যে মিষ্টি ছিল! ও যখন মাঠে দৌড়াত, মনে হতো একটা ঘোড়া যেন তার কেশর নাচিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র সে খেলাধুলায় ভালো ছিল, তা না। আচার-আচরণ, চলাফেরা, কথাবার্তা সব ছিল খুবই প্রাণবন্ত। আসলে ওদের মধ্যে যে সম্পর্ক হয়েছিল, সেটা ইউনিভার্সিটিতে খুব একটা দানা বাঁধেনি। হয়তো কোনোদিন দেখা হয়েছে, তাও একবার। সবকিছুই অসম্ভব শালীনতার মধ্যে ছিল।

(এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। ফাল্গুনী হামিদকে বলছেন কতক্ষণ লাগবে বলতে পারছি না। তাপস রায়হান জোরে বললেন, আর মাত্র আধঘণ্টা। ম. হামিদ হাসতে হাসতে বললেন তুমি ওর কথা বিশ্বাস করো না।) আবার শুরু হলো কথা বলা। দেখো, পরিবারগতভাবে কত সাধারণ জীবনযাপন করত। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব পাঠিয়েছেন খুকুর বাবার কাছে। খুকুর আব্বা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ার। তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেছেন। এখানেও দেখো, তিনি বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল। বিয়েটাও কিন্তু খুবই অনাড়ম্বরভাবে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বলতেন তোমাদের সোনাদানা দিয়ে বিয়ে করতে হবে না। বেলি ফুল দিয়ে করো। শুধু মিষ্টি রেখো। ব্যাপারটা কিন্তু তাই-ই ছিল। যখন কামালের বিয়ে হলো, তখন সম্ভবত বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠানটা হয়েছিল গণভবনের পাশে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরে। বিয়ে হয়েছে আগেই, রিসিপশন ওখানে। তখন বিকেল বেলা। কী খাবার? চা আর মিষ্টি। আমিও গেলাম। তখন কামালকে বললাম কী, সিনিয়র হয়ে গেলে? বঙ্গবন্ধু পাশে দাঁড়ানো। ও মুচকি হাসল। বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিলাম। কিছু ছবি তুললাম। ছবিগুলো হারিয়ে গেছে। সেখানে দেখলাম, কিছু টেবিলে প্লেটে শুধু মিষ্টি রাখা আছে। সবাই একটা দুটো করে খেলাম। এই ঘটনা এ কারণেই বললাম দেখো, আয়োজনটা কত সহজ ছিল। অথচ বঙ্গবন্ধু চাইলে, কী না হতে পারত? তার পরিবারের সদস্যরাও সে রকমই।

লিটু হাসান : আপনার নাম ম. হামিদ। বেশিরভাগ মানুষ পুরো নাম জানে না?

ম. হামিদ : আমার পারিবারিক নাম- কাজী মোহাম্মদ হামিদ। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন থেকেই ম. হামিদ লিখি।

মাহতাব হোসেন : বিটিভির গল্পটা শুনতে চাই?

ম. হামিদ :  আমি বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছিলাম। সেটা করিনি। এরপর অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে বিটিভিতে জয়েন করি ১৯৮০ সালে। সেও অনেক যুদ্ধ করে। তখন তো বিটিভির ভয়ংকর অবস্থা। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা অসম্ভব। সরকার পুরোই বৈরী। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সেখানে অনেক ঘটনা। এভাবেই তো চলে গেল অনেক বছর।

মাহতাব হোসেন : বিটিভির মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। সেটা কেন? একসময় তো জনপ্রিয় ছিল?

ম. হামিদ : জনপ্রিয় হয় কাদের দ্বারা? যারা কাজ করে। 

বিটিভিতে সেই মানুষ নেই। আগের অনুষ্ঠান প্রযোজক নেই, নাট্যকার নেই। আগে আমরা এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলাম। এখন নেয় চাকরি হিসেবে। আগে নাটক লিখতেন আতিকুল হক চৌধুরী, মামুনুর রশীদ,  হুমায়ূন আহমেদরা। আর এখন যারা লিখছেন তারা কারা? ভালো লেখক আমাদের অনেক আছেন। ভালো লেখক মানেই কিন্তু ভালো নাট্যকার নয়। আগের অনুষ্ঠান প্রযোজক কারা ছিলেন? চাকরির সন্ধানে তারা এখন যান। আর আমরা গিয়েছিলাম বিটিভিকে পেশা হিসেবে নিয়ে। আমরা কিন্তু চাকরি করতাম না। পেশাকে ভালোবেসে, শিল্পকে ভালোবেসে আমরা কাজ করতাম। যারা বিসিএসে সুযোগ পায় না, তারা এখন সেখানে যায়।

তাপস রায়হান :  আপনি তো বিটিভির মহাপরিচালক ছিলেন? আমরা জানি বিটিভির  ভেতরে স্বাধীনতাবিরোধীদের একটা শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। আপনার কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়েছে? সমাধান কিছু করতে পেরেছেন?

ম. হামিদ : যতটুকু পেরেছি করেছি।

মাহতাব হোসেন : আপনি এফডিসির এমডি ছিলেন। সেই এফডিসি আর আজকের এফডিসির মধ্যে পার্থক্য অনেক। বর্তমানে তেমন ভালো ছবি নির্মাণের পরিবেশ নেই। শুটিং কম হচ্ছে। অনেকটা কমে গেছে। এটা কি ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে?

ম. হামিদ : আমি যখন গেলাম সেখানে তখন এটা ধ্বংসের দিকেই চলে গেছে। একসময় বছরে ১০০ ছবি হতো। আর আমার সময় হতো ১৫-২০টার মতো হয়। এখানে ফ্যাসিলিটি বাড়াতে হবে। না হলে হবে না। আমিই কিন্তু চলচ্চিত্র দিবস করি। এটা হচ্ছে ৩ এপ্রিল। এই দিনেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুই প্রাদেশিক সরকারের কাছে এফডিসির বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন। তখন তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। আমিই কেবিনেটের মাধ্যমে দিনটিকে চলচ্চিত্র দিবস করি। তারপর চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। এরপর চলচ্চিত্র-টেলিভিশন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করি। এখন তো এটা নো ম্যানস ল্যান্ড হয়ে গেছে। কেউ নজর দিচ্ছে না। এরপর  ছিল এফডিসির জমির বিষয়ে। এটাও বেহাত হয়ে যেত। তাকে আটকালাম। এরপর টেলিভিশনে গেলাম ডিজি হিসেবে।

তাপস রায়হান : বাণিজ্যিক ছবির মূল সমস্যা কি মেধার?

ম. হামিদ : অনেক। মেধা তো আছেই। সেই কাহিনিকার, টিম নেই। 

লিটু হাসান : আপনি এবং স্ত্রী অভিনেত্রী ফাল্গুনী হামিদের বিষয়ে কিছু বলা যাবে?

ম. হামিদ : ঐ তো। ও যখন পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিল তখনই পরিচয়।

তাপস রায়হান : আপনার পারিবারিক জীবন?

ম. হামিদ : ১ মেয়ে আর ১ ছেলে।

তাপস রায়হান : জীবনের অর্থ কী? সময় কাটে কীভাবে?

ম. হামিদ : স্বপ্ন দেখতে হয়। পরিশ্রম করতে হয়। ভালোবাসতে হয়। জীবনটাকে উপভোগ করতে হয়। যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি না কেন? তাহলেই আর কোনো সমস্যা নেই। জীবনে সুখটাই বড় কথা। যাই-ই করি না কেন। জীবনটা ভারাক্রান্ত করার জন্য  নয়, এনজয় করতে হবে। এটাই জীবনের কথা।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত