বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরের ইতি টেনেছেন। সফরের দ্বিতীয় দিন গত বুধবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে লু বলেছেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখন আর পেছনে তাকাতে চায় না বরং সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে কেবলই সামনে তাকাতে চায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একই রয়েছে। তারা এ অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য চায়। নির্বাচন নিয়ে তাদের আলাদা এজেন্ডা ছিল। আর নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ভূরাজনৈতিক এবং কৌশলগত। আওয়ামী লীগকে তারা পছন্দ করুক কিংবা না করুক, তার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে সূত্রগুলো বলছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। চীনের সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো হচ্ছে। আবার রাশিয়ার সঙ্গেও শেখ হাসিনা সরকারের সখ্য একই রকম রয়েছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরেক প্রভাবশালী দেশ ও বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রয়েছে। সেই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে দেশটির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমান সরকার) সরকারের সমালোচনাসহ বেশ কিছু কর্মকাণ্ড ছিল আলোচিত। ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরাও ঢাকায় নির্বাচন নিয়ে নানা সংশয় ও আশঙ্কার কথা বলেছে এবং নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ দিয়েছে। তবে তা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে তারা আর কোনো ধরনের পরামর্শ দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত চাপ ঘিরে একটা ধারণা হয়েছিল, এ সরকারের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের সম্পর্কের বৈরিতা আরও বাড়বে। তাছাড়া সরকারপ্রধান এবং সরকারদলীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাও গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং সরকারের প্রতিরোধ করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্ন তুলেছিলেন তাদের মানবতা কোথায়?
ফলে ধারণাই করা হচ্ছিল, ঢাকা-ওয়াশিংটন দূরত্ব আরও বাড়বে। কিন্তু ডোলাল্ড লুর সফর আলোচনার গতি ঘুরিয়ে দিয়েছে। কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সুর পাল্টেছে। কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, শ্রম আইন নিয়ে তার কাজ অব্যাহত রাখবে। ফলে এখনই বলার সময় হয়নি দেশটি মত বদলেছে। কারও মধ্যে প্রশ্ন, বাইডেন প্রশাসনের এটা কি কোনো কৌশল?
বলা হচ্ছে, গত ১৫ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের টানাপড়েন চলছে। নানা ইস্যুতে ওয়াশিংটন তাদের আপত্তির বিষয়গুলো জানিয়ে আসছে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবেই তারা এমন অবস্থান নিয়েছে। ফলে আগে তারা ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখত। কিন্তু গত দুই বছর ধরে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। আবার ভারত যেহেতু এ সরকারকে বলা যায় প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে, তাই যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে, এ অঞ্চলে ভারতের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে সুফল দেবে না। ফলে ভারতের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে তারা কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চায় না।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই পশ্চিমা বলয়ের বাইরে গিয়ে চীনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ না হয়। এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান জোরালো উপস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ। তাই তারা নির্বাচন কেন্দ্র করে বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা দেখল নির্বাচন করে ফেলেছে শেখ হাসিনা সরকার। এরপর টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনও করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, অনেক প্রভাবশালী দেশ এ সরকারকে সমর্থন দিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। আবার চীন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অনেক নতুন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রও মনে করছে, তাদের এজেন্ডা নিয়ে তারা সামনে এগোবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন নিয়ে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্যও রয়েছে। কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করে আসছে। সর্বশেষ ভিসানীতি, শ্রমনীতি এবং এর আগে র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ মানবাধিকার নিয়ে তাদের চাপে সরকার নমনীয় হবে এমনটাই ধারণা করেছিল পশ্চিমা দুনিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একমুখী কূটনীতি থেকে বেরিয়ে বহুমুখী সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছে। সেদিকে থেকে ঢাকার সফলতাও রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র এতদিনে বুঝতে পেরেছে যে, তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের বিরোধীপক্ষ ততটা শক্তিশালী অবস্থানে নেই আপাতত। আবার ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা বিব্রত। সব মিলিয়ে নির্বাচনের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলতগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে, এটাও বলে গেছেন ডোনাল্ড লু।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তারা মনে করেন, পাকিস্তানে সাম্প্রতিককালের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় আঘাত। তারা দেখেছে, তাদের এ কৌশল ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেজন্য পাকিস্তানে তারা যা করেছে সেটা বাংলাদেশে প্রয়োগ করার দিকে যায়নি। বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাদের একটা সম্পর্ক থাকুক এবং এ সম্পর্কের মাধ্যমে তারা তাদের বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থগুলোকে এগিয়ে নিক, সেটাই তাদের অগ্রাধিকার এখন। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক এজেন্ডা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বোয়িং বিমান বিক্রি করা, গভীর সমুদ্রবন্দরে তেল-গ্যাসের অনুমতি আদায় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় দেশটি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রকে সরকার নিয়ে খুব অ্যাগ্রেসিভ কথা বলতে দেখা যায়নি। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তারের সফরেও তা দেখা গেছে। গণতন্ত্র মানবাধিকার এসবের বাইরেও যেকোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রেরও অনেক বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। ইন্দো-প্যাসিফিকে বড় স্বার্থ রয়েছে। আছে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।’
বাংলাদেশ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভূরাজনৈতিকভাবে এখন গুরুত্বপূর্ণ এ কথা উল্লেখ করে এ বিশ্লেষক বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবেও সরকারের পদক্ষেপ ভালো। তবে খুব বুঝেশুনে এগোতে হবে। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূলনীতিকে ধরে সম্পর্কগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে হবে।’
আরেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। তাদের আলাদা আলাদা উইং রয়েছে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে তাদের অন্য টিম কাজ করে। লুর সফর ছিল কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো জোরদার করা। দুই দেশের জন্যই লুর বার্তা স্বস্তিকর।’
