শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে যত অজ্ঞতা

আপডেট : ১৮ মে ২০২৪, ০৭:৩৪ পিএম

অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে অন্যতম উচ্চ রক্তচাপ, যা স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত। এর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ জরুরি। না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে। তাই সচেতন থাকার বিকল্প নেই। কারও রক্তচাপ নরমাল মাত্রার চেয়ে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময় এমনকি বিশ্রামকালীনও বেশি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। 

একবার উচ্চ রক্তচাপ হলেই কি রোগী ভাবা হবে?

উত্তর: না, কেউ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে তা বলার আগে কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যেমন– অন্তত তিন দিন ভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার রক্তচাপ মাপা। যদি দেখা যায় রক্তচাপ বেশি, তবেই তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বসে রক্তচাপ মাপা উচিত, শরীর ও মন যেন শান্ত থাকে, এমন সময় রক্তচাপ মাপতে হবে।

লক্ষণ না থাকলেও চিকিৎসা বা ওষুধ খেতে হবে?

উত্তর: অনেকেই মনে করেন উচ্চ রক্তচাপ তার দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা করছে না বা রোগের লক্ষণ নেই, তাই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে খারাপ দিক। নিয়ন্ত্রণ করা না হলে উচ্চ রক্তচাপ ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন– হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না যাকে হার্ট ফেইলিওর বলে। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়ে কার্যকারিতা হারাতে পারে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হয়ে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে এবং চোখের রেটিনাতে রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের জটিলতা এড়াতেই ওষুধ দেওয়া হয়।

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন খুবই জরুরি?

উত্তর: অনেকেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরও ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারও ধারণা, একবার ওষুধ শুরু করলে  সারাজীবন খেতে হবে। তাই ওষুধ শুরু না করাই ভালো। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও বিপজ্জনক। মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ সারে না, নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নিয়মিত ওষুধপত্র গ্রহণের মাধ্যমে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ বন্ধ করা যাবে?

উত্তর: অনেক রোগী কিছুদিন ওষুধ সেবনের পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। মনে করেন ভালো আছি ওষুধ খাওয়ার দরকার কী? এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগী হঠাৎ করে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমন কি মৃত্যুও হতে পারে। ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তরা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চেকআপ করাতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ শুধু বয়স্কদেরই হয়?

উত্তর: শুধু বয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। যে কোনো বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, বয়স হলে রক্তচাপ একটু বেশিই থাকে, এ জন্য চিন্তার কিছু নেই, এ ধারণাও ঠিক না। উচ্চ রক্তচাপ যে বয়সেই ধরা পড়ুক, তাকে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। 

তরুণ বয়সে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে কি?

উত্তর: অল্প বয়সেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে সন্তানেরও উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়াও অন্যান্য কারণ যেমন– অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ইত্যাদি। অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা, খেলাধুলা, ব্যায়াম বা কায়িক শ্রমের অভাবে অল্প বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ছে। কিডনির রোগ, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার, ধমনির বংশগত রোগ, গর্ভধারণ অবস্থায় অ্যাকলাম্পসিয়া ও প্রি অ্যাকলাম্পসিয়া হলে, অনেক দিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ির ব্যবহার, স্টেরয়েড গ্রহণ ও ব্যথা নিরামক কিছু  ওষুধ সেবন করলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে।

উচ্চ রক্তচাপ হলে ঘাড় ব্যথা হয় কি?

উত্তর: ঘাড়ে ব্যথা হলে কেউ কেউ মনে করেন, নিশ্চয়ই রক্তচাপ বেড়েছে। এই ধারণা অমূলক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রক্তচাপ বৃদ্ধির কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। 

লবণ ভেজে খাওয়া যাবে কি? 

উত্তর: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে বাড়তি লবণ ব্যবহার ঠিক না। তরকারিতে যতটুকু লবণ দেওয়া দরকার ততটুকু খাওয়া যাবে। অনেকের ধারণা, কাঁচা লবণ নিষেধ, কিন্তু লবণ ভেজে খাওয়া যাবে। এ ধারণাও ভুল। কাঁচা বা ভেজে খাওয়া লবণে কোনো পার্থক্য নেই।

মাংস, ডিম, দুধ খাওয়া নিষেধ কি? 

উত্তর: উচ্চ রক্তচাপ হলে মাংস, ডিম, দুধ খাওয়া নিষেধ। এসব খাবার খেলে রক্তচাপ বাড়ে। এটা ঠিক নয়। পরিমাণ মতো এগুলো খাওয়া যাবে, তবে গরু বা খাসির মাংসের চর্বি বাদ দিতে হবে।

তেঁতুল বা টক খেলে রক্তচাপ কমে কি?

উত্তর: রক্তচাপ বাড়লে পানিতে তেঁতুল গুলে খেলে বা টক খেলে রক্তচাপ কমবে। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, তেঁতুল বা টক খাওয়ার সঙ্গে রক্তচাপ কমার সম্পর্ক নেই।

উপসংহার: অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, মদ্যপান, তেল-চর্বিজাতীয় খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনাচরণ পরিবর্তন করে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ওষুধ সেবনের বেলায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জীবনযাপন পদ্ধতির সঠিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিত ওষুধ সেবন জরুরি। যারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তাদের ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিয়মিত চেক করাতে হবে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত