টানা ২৬ মাস ধরে দেশের গড় মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। অর্থনীতির পরিভাষায় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি কম হলে সেটি অর্থনীতির সংকটকে ইঙ্গিত করে। দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের পরিবারগুলোর সঞ্চয় কমে গেছে। বাড়তি পণ্যমূল্য সামাল দিতে সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাচ্ছে মানুষ। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিংয়ে। চলতি অর্থবছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) স্কুল ব্যাংকিংয়ে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয় কমেছে ১০ শতাংশের বেশি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামেনি। এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতিও প্রায় দুই অঙ্কের ঘরে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা ব্যয়ও বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। ফলে পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়তি টাকা প্রাপ্তি কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্কুলশিক্ষার্থীদের সঞ্চয়েও। তবে শিক্ষার্থীদের আমানত কমলেও বেড়েছে তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার পরিমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৯ কোটি, যা মার্চে এসে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকায়। এ হিসাবে গত নয় মাসে স্কুল ব্যাংকিংয়ে সঞ্চয় কমেছে ২৩৫ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ২২ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের আমানত কমছে। চলতি অর্থবছরের আগস্টে স্কুল ব্যাংকিংয়ে শিক্ষার্থীদের আমানত ছিল ২ হাজার ২৮৫ কোটি, যা সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ২৩২ কোটি টাকায় নেমে আসে। এরপর অক্টোবরে ২ হাজার ২০২ কোটি, নভেম্বরে ২ হাজার ১৯৯ কোটি, ডিসেম্বরে ২ হাজার ১৭৯ কোটি, জানুয়ারিতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১৩৬ কোটি এবং ফেব্রয়ারিতে ২ হাজার ১০৯ কোটি টাকায় নেমে দাঁড়ায়। এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে আমানত কমেছে ৮ শতাংশের বেশি।
এদিকে স্কুলশিক্ষার্থীদের আমানত কমলেও চলতি অর্থবছরে স্কুল ব্যাংকিংয়ে হিসাব খোলার পরিমাণ ৭ শতাংশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চে স্কুল ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮০টি, যা অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ে ছিল ৩৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৩টি।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্চ শেষে মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের মধ্যে ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৪২১টি হিসাব শহরাঞ্চলে এবং ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৯টি হিসাব গ্রামাঞ্চলে খোলা হয়েছে। ছেলেদের হিসাব ছিল ২১ লাখ ৫৭ হাজার ৩২০। এর মধ্যে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৯টি শহরে আর গ্রামে ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬১টি। এ সময়ে মেয়েদের হিসাব ছিল ২০ লাখ ১৭ হাজার ৪৬০টি, যার মধ্যে শহরে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৬২, গ্রামে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৮।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ছেলেদের অ্যাকাউন্ট ছিল ২১ লাখ ৫৭ হাজার ৩২০টি; এর মধ্যে শহরে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৯, গ্রামে ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬১টি। মেয়েদের অ্যাকাউন্ট ছিল ২০ লাখ ১৭ হাজার ৪৬০টি; যার মধ্যে শহরে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৬২, গ্রামে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৮টি।
শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহী করতে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচির পুনঃপ্রবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেশ সফলতা পায় আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তবে করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানতের পরিমাণ কিছুটা কমে আসছে। এরপর থেকেই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বছরে ২৯ হাজার ৮০টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়। এর পরের বছর ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ব্যাংকগুলোতে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়।
