চোরাকারবার না রাজনৈতিক বিরোধ

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০৬:২৬ এএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের নিখোঁজ হওয়ার আলোচনার মধ্যেই তার হত্যাকাণ্ডের খবর জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ। গতকাল বুধবার আনার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, এ দাবি করে প্রতিবেশী দেশটি। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশও হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিদেশের মাটিতে দেশের ক্ষমতাসীন দলের একটি সংসদ সদস্য খুনের এ ঘটনার কারণ যেমন পুলিশ খুঁজছে, তেমনি আওয়ামী লীগও জানতে চায়। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে কৌতূহল রয়েছে।

সংসদ সদস্য (এমপি) আনার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতিও। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকা এই নেতা সম্পর্কে ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তের চোরাকারবারের প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। এ ছাড়া ভারতে যার বাসায় গিয়ে উঠেছিলেন, সেই গোপাল বিশ্বাস তার দীর্ঘদিনের বন্ধু। কলকাতায় গোপাল বিশ্বাসের সোনার ব্যবসা রয়েছে। ফলে চোরাকারবারি না রাজনীতি এ দুটি বিষয়ই এখন সামনে আসছে। বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা রাজনৈতিক বিরোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা আপাতত রাজনৈতিক বিরোধ সামনে তুলে আনার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, রাজনৈতিক বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে না। চোরাকারবারের দিকেই ইঙ্গিত করতে চান দলের বিভিন্ন পদে থাকা নেতারা। স্থানীয় রাজনীতিতেও একই আলোচনা চলছে। তবে রাজনৈতিক বিরোধ শেষ পর্যন্ত উঠে এলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ব্যাপারটি অস্বাভাবিক একটি ঘটনা হবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনোয়ারুল আজিম আনার এলাকায় জনপ্রিয় ছিলেন। আমি তার এলাকায় কয়েকবার গিয়েছিলাম, সেখানে তার জনপ্রিয়তা দেখেছি, তার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ ছিল না।’

কামাল হোসেনের দাবি, আনারের পরিবার বলছে এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা কারা আছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদেওয়া উচিত বলে জোর দাবি তোলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।

দলের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিরোধ নয়। ছোটখাটো বিরোধ থাকতে পারে, হত্যা করার মতো বড় কোনো বিরোধ স্থানীয় রাজনীতিতে আনারের সঙ্গে কারও নেই। ওই অঞ্চলের রাজনীতি দেখভাল করা এই নেতা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণকে দলীয় অন্তঃকোন্দলে রূপ দিতে যাওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। তাতে রাজনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে ঝিনাইদহ জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বলে বোঝার চেষ্টা করেছে দেশ রূপান্তর। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও রাজনীতি নিয়ে বিরোধের জের ধরে আনারকে হত্যা করা হয়েছে, সেটা মানতে নারাজ। তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মতো বিরোধের রাজনীতি আনার করেননি। সংগঠনে কমবেশি নিয়ন্ত্রণ আনারের ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয়তা ছিল।

ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সফিকুল ইসলাম অপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিরোধের বলি হওয়ার মতো রাজনীতি আনার করেননি। আমার জানা মতে, সব মহলেই আনার জনপ্রিয়।’ ওই জেলা আওয়ামী লীগের আরেক নেতা বলেন, ‘স্থানীয় প্রতিপক্ষ বিএনপি মহলে অনেকটা সমাদৃত ছিলেন আনার।’

তবে চোরাকারবারি বা রাজনৈতিক বিরোধ যেটিই হোক তদন্তের মাধ্যমে তা উঠে আসবে বলে প্রত্যাশা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম। তিনি দোষীদের খোঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন। সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কলকাতা পুলিশের সহযোগিতায় সত্যিকারের অপরাধীরা যাতে আইনের আওতায় আসে, এটাই চাওয়া।

আনারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর ও খুলনার কিছু অংশ একসময় সন্ত্রাসের জনপদ ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তার দাবি, এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকারকে বিস্তর সহযোগিতা করেছিলেন আনোয়ারুল আজিম আনার।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, এমপি আনারের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সীমান্তের চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। পাচারকারী চক্রের অর্থ আত্মসাতের কানাঘুষাও আছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বাংলাদেশি ও ভারতীয় চক্রের প্রতিশোধের শিকার হতে থাকতে পারেন আনার এমন আলোচনাও আছে নানা মহলে। ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত পথে চোরাচালান চক্রগুলোর ওপর তার প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হতে পারে এমপি আনারের, যার পরিণতিতে তাকে কোনো প্রলোভন দিয়ে ভারতে নিয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোও এসব খতিয়ে দেখছে।

তাছাড়া ২০০৭ সালের দর্শনা এলাকার সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী সাইফুল হত্যা মামলার প্রতিশোধ নিতেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার দুজন ব্যবসায়ী ও ঝিনাইদহের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি এমপি আনার খুনের পরিকল্পনায় জড়িত বলে তারা তথ্য পেয়েছে। তাদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, খুনের পরিকল্পনা হয়েছে ঢাকার বনানী এলাকায়। সংসদ সদস্য দেশের বাইরে গেলে সঙ্গে কাউকে না কাউকে নিয়ে যেতেন। কিন্তু ভারতে গেলে তিনি একা যেতেন। এতে রহস্য রয়েছে। ডিবির হেফাজতে যারা আছে, তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তারাও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

জানা গেছে, এমপি আনার চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন।

আনোয়ারুল আজিম আনার ২০০৪ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী হুন্ডি ব্যবসা, সোনা চোরাচালানসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড অ্যালার্ট জারি ছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইন্টারপোল থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। এ কারণে তিনি ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পাননি। ২০০৯ সালে কালীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। টানা তিন মেয়াদে এমপি তিনি। গত বছর কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হন আনোয়ারুল আজিম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত