প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় রহস্যজনক ও নাটকীয়ভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার। এক সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর তিনি খুন হয়েছেন বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ। তবে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার মরদেহ উদ্ধার হয়নি। রহস্যঘেরা এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যেন মুখে কুলুপ এঁটেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এমপি আনার নিখোঁজ হওয়ার পর গত কয়েক দিনে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দেশ রূপান্তর কথা বলার চেষ্টা করলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি হননি। হত্যাকাণ্ডের শিকার এই এমপির বিরুদ্ধে নানান অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। আবার কারও কারও বক্তব্যে তাকে নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দাবি করেন, আনোয়ারুল আজিম আনার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে এমন হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা। তারা এ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ উদঘাটনেরও দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে তারা আরও বলেন, ঘটনাটি কোনোভাবেই সহজভাবে নেওয়ার নয়। একজন সংসদ সদস্যের এমন পরিণতির কারণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
এমপি আনারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর ও খুলনার কিছু অংশ একসময় সন্ত্রাসের জনপদ ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেই পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আর এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকারকে বিস্তর সহযোগিতা করেছিল আনোয়ারুল আজিম আনার।’
গতকাল দুপুরে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ারুল আজিম কলকাতায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশিরা জড়িত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরবে না। কারণ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের কেউ জড়িত নয়।
দলীয় এমপির এমন পরিণতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রয়াত এই এমপির ভালোমন্দ বিচার না করে হত্যার কারণ উদঘাটন এখন জরুরি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এখন জরুরি।’
আনার হত্যায় জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এ নেতা বলেন, ‘এটা উদ্বেগের। একজন এমপির এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দলের সবাইকে হতবাক করেছে।’
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘দেশের বাইরে গিয়ে একজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হলো, এটা উদ্বেগজনক বটে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক, আমরা সেটাই চাই।’
তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কলকাতা পুলিশের সহযোগিতায় সত্যিকারের অপরাধীরা যাতে আইনের আওতায় আসে এটাই চাওয়া।’
আনোয়ারুল আজিম হত্যাকাণ্ডকে অস্বাভাবিক ও দুঃখজনক ঘটনা বলে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত এ নেতা বলেন, ‘এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিস্তারিত জানার পর পূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে।’
আনোয়ারুল আজিম এলাকায় জনপ্রিয় ছিলেন বলে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার এলাকায় কয়েকবার গিয়েছিলাম, সেখানে তার জনপ্রিয়তা দেখেছি, তার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ ছিল না। তার পরিবার বলছে, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা কারা আছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
আনোয়ারুল আজিম আনার ২০০৪ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হুন্ডি কারবার, সোনা চোরাচালানসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি ছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট থেকে আনারের নাম বাদ দেওয়া হয়। এসব কারণে তিনি ২০০৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পাননি। ২০০৯ সালে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। টানা তিন মেয়াদের এমপি তিনি। গত বছর কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন আনোয়ারুল আজিম।
পরিবার বলছে, চিকিৎসার জন্য গত ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার গেদে সীমান্ত দিয়ে কলকাতায় যান আনোয়ারুল আজিম আনার। পরদিন ১৩ মে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় তার। পাঁচ দিন পর ১৯ মে ঢাকার গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) কার্যালয়ে গিয়ে বাবার নিখোঁজের কথা জানান আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
এর আগে গত ১৮ মে আনার নিখোঁজ জানিয়ে কলকাতার বরাহনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাস, যিনি নিজেকে আনারের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন।
