দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, দুর্নীতিবাজদের বিভিন্ন সংগঠনে প্রধান করা হচ্ছে, অনুষ্ঠানের অতিথি করে তাদের প্রথম সারিতে বসানো হচ্ছে। নাগরিকরাই দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘দুর্নীতি দমনে নাগরিকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন এইচআরপিবির সভাপতি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতিকে কেউ সমর্থন করে না। প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে আপনিও দুর্নীতিকে সহায়তা করছেন। এই বিবেকটা একটু জাগ্রত করুন।’ তিনি বাড়ির মালিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার বাসাভাড়া ৫০ হাজার টাকা অথচ যার বেতন ২০-৩০ হাজার টাকা তাকে বাসাভাড়া দিচ্ছেন কেন। নাগরিকদের কী কিছুই করার নেই। কিছু করার না থাকলে বর্জন তো করতে পারি।’
মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন হয়, তাহলে দুদকে কোনো অভিযোগই আসবে না। দুর্নীতি রেখে উন্নয়ন হলেও তা কখনো টেকসই হবে না। নাগরিকরা যদি দায়িত্ব পালনে সচেতন হন এবং পারিবারিক পর্যায়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখেন, তাহলে আশাপ্রদ ফলাফল হবে।’
ঋণ খেলাপি ও অর্থ পাচার প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘নিয়মের বাইরে কাজ করলেই তো দুর্নীতি হয়। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট দুর্নীতির জন্য দায়ী। সব ডিপার্টমেন্টে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে দুর্নীতি-অনিয়ম সব হচ্ছে। যারা ছেড়ে দিয়ে রেখেছে তারা আবার দেখছে দুদক কী করে। সেবা ক্রয়, টেন্ডারে সেখানে লোকজন যদি তাদের কাজটা ঠিকমতো করে, আমাদের কাছে দুর্নীতির অভিযোগ কম আসবে। অর্থ পাচার হওয়ার পর জাতি জানতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউ অর্থ পাচারের আমাদের একটা তথ্য দিয়েছে ছয় মাস পরে।’
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার ডলার পাঠাবেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পারমিশন ছাড়া আপনি কি পারবেন? তাহলে টাকা পাচার হয় কীভাবে? মন্দ ঋণ যে হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে ও অন্য ব্যাংকের নিরীক্ষা আছে না? তারা তো নিরীক্ষা করে। যখন খেলাপি হয়ে যায় তখন জানা যায়। এর আগে কারা জানতে পারে ঋণগুলো যখন প্রসেস হয়, দেওয়া হয়। যে যার কাজ করছে না। তার ভেতরে দুদক নিয়ে আপনাদের অনেক প্রত্যাশা, এত প্রত্যাশা যে আমরা আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আগাতে পারছি না।’
মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, ‘অধিকাংশ অভিযোগে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকে না, যার কারণে কোনো প্রমাণ ছাড়া মামলা করা সম্ভব হয় না। নাগরিকরা সচেতন না হলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে না। দুর্নীতি দমনে দুদক ইতিমধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচারণা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সততা স্টোর স্থাপন করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।’
সভায় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘বর্তমানে কিছু নতুন ব্যবসায়ী যারা আগে কখনো ব্যবসা করেননি, তারা প্রচুর অর্থের মালিক হয়েছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, আমলা, রাজনীতিবিদসহ অনেকেই জড়িত।’
মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘দুদক কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুদকে ডেপুটেশনে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংস্থাটি ব্যবস্থা নিতে পারে না। দুদক মামলা খুব কম করছে। চুনোপুঁটি ধরা হচ্ছে। দু-একজন রাঘববোয়াল ধরা হচ্ছে। ১০০ রাঘববোয়ালের মধ্যে মাত্র যদি পাঁচজন ধরেন এটা কিন্তু বলতে পারব না, এটা যথার্থ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেভাবে দুর্নীতি বাড়ছে এজন্য দুদকে চৌকস কর্মকর্তা দরকার। অনেক প্রভাবশালী আছেন যারা জেলা প্রশাসকদের ভয়ভীতি দেখান। ডিসিদের তারা পাত্তা দেন না, ডিসিরা মুভ করতে পারেন না। এমন ঘটনাও আমরা জানি। অনেক উপজেলায় একদম একনায়কতন্ত্র শাসন চলে।’ এর মধ্যে দুদক, যার কোনো হাতিয়ার ও অস্ত্র নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করে দুদক মামলাটি কোর্টে নেবে। এখানে স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পারায় দুদক প্রকৃত ঘটনা বের করতে পারে না।’
সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামিম হায়দার, এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন প্রমুখ।
