‘ঈদ উৎসব’ করতে তৈরি মসলা সিন্ডিকেট

আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ০৭:৫০ এএম

তিন সপ্তাহ পর ঈদুল আজহা অর্থাৎ কোরবানির ঈদ। এ ঈদে মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায়। বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে প্রতিবছর এ সময়ে মসলার দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অজুহাতে এবার হাওয়া জোগাচ্ছে ডলারের বাড়তি দাম। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিনিময়মূল্য সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে অথচ কোনো কোনো মসলার দাম ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এলাচের। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এলাচের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। অন্যান্য মসলার মধ্যে জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গের দাম গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর জন্য ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, গেল প্রায় দুই বছরে ডলারের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ডলারের অভাবে এলসি খোলায় সমস্যা হয়েছে। নগদ অর্থ জমা দিয়েও খোলা যায়নি। এলসি যদিও খোলা গেছে, ব্যাংক-দরের বেশি দরে ডলার কিনতে হয়েছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি ও বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে জানা গেছে, আমদানি করা এলাচ এখন মানভেদে প্রতি কেজি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও দাম ছিল ২ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। চট্টগ্রামের বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকায়, এক মাস আগে ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।

ঢাকার বাজারে কেজিতে ১০০-২০০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি গোল মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ ও সাদা গোলা মরিচ ১ হাজার ১০০ টাকায়। জিরা এক মাসে ৫৮০-৬২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন প্রতি কেজি ৭৫০-৯২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধনের কেজি এখন ২০০ থেকে ২৪০ টাকা আর তেজপাতা ১৫০-২০০ টাকা।

চট্টগ্রামের বাজারে আমদানি করা আদা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। এক মাস আগে ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া রসুন এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

রাজধানীর মৌলভীবাজারের মিজান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাকার অবমূল্যায়নের জন্য দেশে মসলার দাম বেড়েছে। দুই বছর ধরেই এলসি খোলা নিয়ে জটিলতা চলছে। ঘোষিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব বাজারে পড়েছে।’

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি আতিকুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার ভারতেও এলাচের দাম বেশি। নতুন করে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। মসলার বাজার চড়া।’

বাজারে মসলার দাম বাড়ার জন্য খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, পাইকারি বাজারে হঠাৎ করে মসলার দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।

রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গেল এক বছরে গড়ে প্রতি কেজি মসলার দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। সব থেকে কম ১১ শতাংশ দাম বেড়েছে দারুচিনির। লবঙ্গে ১৭, ধনিয়ায় ৫২, তেজপাতায় ৫২ শতাংশ এবং সব থেকে বেশি এলাচে ৬১ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর প্রতি কেজি এলাচ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ওই সময় লবঙ্গের দাম ছিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

জানা গেছে, বাজারে মসলা পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কোরবানির ঈদের বাড়তি চাহিদাকে সামনে রেখে কৌশলে দাম বাড়াচ্ছে। মসলার নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অন্য খাতের কিছু ব্যবসায়ীও যুক্ত হয়েছেন। বাজারে যেসব মসলা রয়েছে, তা অন্তত দুই মাস আগে আমদানি করা। সম্প্রতি ডলারের যে দাম বেড়েছে, তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য মতে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৬৮৮ টন এলাচ, ১ হাজার ৫১৭ টন জিরা, ১০০ টন দারুচিনি, ৩৬ হাজার ৫২৪ টন আদা ও ৪৯ হাজার ৩৮৩ টন রসুনের শুল্কায়ন হয়েছে। ভারত থেকেও বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে মসলার আমদানি হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের মসলা আমদানিকারক মেসার্স এবি ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি অমর কান্তি দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলাচ, পেঁয়াজ, জিরাসহ মসলাজাতীয় পণ্যের একটি বিরাট অংশ ভারত থেকে আসে। ভারতে দাম বাড়লে এখানেও বাড়ে। এ ছাড়া, ডলারের দামের কারণে অনেক আমদানিকারক ঠিকভাবে এলসি খুলতে পারছে না। মসলার বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।’

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সগীর আহমদ বলেন, ‘এ মুহূর্তে মসলার বাজারে খুব একটা ক্রেতা নেই। তারপরও কিছু পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে খাতুনগঞ্জেও দাম বাড়ে-কমে। সিন্ডিকেট করে মসলার দাম বাড়ানোর বিষয়টি সঠিক নয়।’

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলার দাম বাড়ার পেছনে কিছু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীর অসাধু প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করছেন ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নাগরিক উদ্যোগের প্রধান উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পণ্য আমদানি করতে হলে আগে এলসি খুলতে হয়। এরপর শিপমেন্ট। এরপর বাজারজাতকরণ। এখন যেসব মসলার দাম বাড়ানো হচ্ছে, তার সবই অনেক আগে আমদানি করা। ডলারের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটা অসাধু ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা করার মানসিকতার কারণে ঘটছে।’

মসলার দাম বাড়ার পেছনে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনের মনিটরিংয়ের দুর্বলতা দায়ী বলে মন্তব্য করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা অজুহাত দেখিয়ে মুনাফা লুটছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত