ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটারের জন্য যা যা আয়োজন তার কোনো কিছুই ঘাটতি ছিল না নির্বাচন কমিশনের। তারপরেও আশানুরূপ ভোটারের দেখা মেলেনি। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপের ভোটেও ভোটার খরা কাটেনি। ৮৫ উপজেলার নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে ভোট পড়েছে ৩৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের ভোটের প্রতি আগ্রহ কমেছে। আস্থার সংকটের কারণে ভোটাররা ভোট দিতে আসছে না। বিএনপিসহ মূলধারার একাধিক দল নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম। এছাড়া ভোটের আগেই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের বিজয়ী মনোভাবও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিদায়ী সচিব মো. জাহাংগীর আলম বলেছেন, ‘আমরা এখন পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাইনি। তবে তৃতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৮৭ উপজেলায় ৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে, ভোট পড়ার এ হার আরও বাড়তে পারে। কারণ এখনো অনেক কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
যদিও একদিন আগে ভোট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছিলেন, এ যাবৎ উপস্থিতির যে তথ্য পেয়েছি সেটা আমাদের পর্যালোচনায় ৩৫ শতাংশের কম-বেশি হতে পারে। বেশিও হতে পারে।
ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে ১০৯ উপজেলায় ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও অন্যান্য কারণে ২৫টি উপজেলায় ভোট স্থগিত করেছে কমিশন। ফলে গত বুধবার ৮৭টি উপজেলায় ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইসি সচিবালয় থেকে অসম্পূর্ণ একটি নির্বাচন প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, ৮৫টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোট পড়েছে ৩৬ শতাংশ, ৭৯ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৬ দশমিক ৩১ শতাংশ, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তিন পদে ভোট পড়েছে গড়ে ৩৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।
চেয়ারম্যান পদে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায়। এ উপজেলায় ভোট পড়েছে ৫৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায়। এ জেলায় ভোট পড়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর বর্জনের মুখে ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন চলছে। ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে নির্বাচন উপযোগী ৪৮৫ উপজেলায় চার ধাপে ভোট হচ্ছে এবার। নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে একগুচ্ছ বিধি সংশোধন করে ইসি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ করতে ভোটার স্বাক্ষর জমাদান বিধান বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে ভোটার টানতে দলীয় প্রতীক না দিয়ে প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবুও মিলছে না কাক্সিক্ষত-সংখ্যক ভোটার।
প্রথম ধাপের নির্বাচন হয় গত ৮ মে। ওইদিন ভোট পড়েছিল মাত্র ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২১ মে দ্বিতীয় ধাপে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন ১৫৬ উপজেলার নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৩৮ শতাংশ।
ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় বেশ সমালোচনায় পড়তে হয় নির্বাচন কমিশনকে। উপজেলা নির্বাচনের ভোটের খরা কাটাতে নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থারও পরিবর্তন আনতে হবে। নির্বাচনের প্রতি অনাস্থার কারণে বেশিরভাগ দল উপজেলা নির্বাচনের বাইরে। এ অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে, নির্বাচন নিয়ে মানুষের অনীহা কাটবে না।
প্রথম ধাপে ভোটার কম হওয়ার জন্য ধান কাটার মৌসুম ও বৈরী আবহাওয়াকে দায়ী করলেও দ্বিতীয় ধাপে এসে রাজনৈতিক সংকটকেই ভোট কম পড়ার অন্যতম কারণ বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তার মতে, কম ভোটার উপস্থিতির অন্যতম কারণ হলো একটা বড় রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ভোট বর্জন করেছে। তারা জনগণকে ভোটদানে নিরুৎসাহিত করেছে।
তবে ভোট নিয়ে কোনো সংকট নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংকটটা রাজনীতিতে। আমি মনে করি, রাজনীতিতে যে সংকটটা রয়েছে, অবশ্যই একটা সময় কাটিয়ে ওঠা যাবে। সুস্থধারায় সামগ্রিক রাজনীতি প্রবাহিত হবে, ভোটাররা উৎসাহিত হবেন।
দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে তার পেছনে নির্বাচন কমিশনের দায় রয়েছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক সংকটটা কেন হলো? সে প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশন কেন দিচ্ছে না? নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনেক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সে যদি তার কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ না করে তাহলে সংকট কাটবে না।
তিনি বলেন, আস্থার সংকটাই হচ্ছে বড় সংকট। নির্বাচনব্যবস্থা, নির্বাচনের প্রার্থী, কোনো কিছুর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নেই। এ আস্থার সংকটের কারণে জনগণ ভোট দিতে চায় না।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ- জানিপপ চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, নির্বাচন কমিশনের আয়োজনের কোনো ঘাটতি নেই। আমি তৃতীয় ধাপের ভোটে কয়েকটি জায়গা পরিদর্শন করেছি। ভোটার উপস্থিতি অনেক কম। সাধারণ মানুষের ভোটের প্রতি আগ্রহ কমেছে।
নির্বাচন উৎসবমুখর করতে হলে আইনের পরিবর্তন করা উচিত বলে মনে করেন এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক। তিনি বলেন, ৪০টি দল এবারের উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আইন পরিবর্তন করে হয় দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। না হলে পার্সেন্টেস নির্ধারিত করে দিতে হবে। তা না হলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করা যাবে না।
