সুন্দরগঞ্জের এক টুকরো ‘অসুন্দর’

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৫:৩৭ এএম

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রাম। ওই গ্রামে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য রয়েছে আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার নাম ঘগোয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। টিনশেড বিদ্যালয় ভবনের পাশে ঘগোয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ঘগোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে গাইবান্ধার বালিকা বিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থী চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দিলেও সবাই ফেল করেছে।

যেখানে একসঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষার সুন্দর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেখানে মেয়েদের বিদ্যালয়টির এমন হাল কেন?

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পরীক্ষায় বসা সবাই মানবিক শাখার। তাদের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী ৯ জন। তারা এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষাও ফেল করেছিল। বাকি ৫ জন পুরনো সিলেবাসের। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮ জন বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জন গণিতে, ৫ জন কৃষি,’ বাংলা, ধর্ম, ইংরেজিসহ একাধিক বিষয়ে ফেল করেছে।

গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পাঠদান চলছে। কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের মাঠে খেলা আর বসে আড্ডা দিচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষক কার্যালয় কক্ষে বসে আছেন। ১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক বিদ্যালয়ে নেই। তবে প্রধান শিক্ষক হাজিরা খাতায় একজন সহকারী শিক্ষককে অনুপস্থিত দেখান। ৩০ মিনিট পর দুজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে আসেন। বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ২১ জনের মধ্যে মাত্র ৮ জন বিদ্যালয়ে উপস্থিত। অবশ্য প্রতিটি শ্রেণিতেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির চিত্র অনেকটা এ রকমই দেখা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, অন্য বিদ্যালয় থেকে এখানে শিক্ষার্থী কম। যে কজন আছে, তারাও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। এ বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ভর্তি করেন না। তারা বলছেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের যদি পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়া হয় তাহলে বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী আসবে নাএমন আশঙ্কা ছিল শিক্ষকদের। এ ছাড়া অভিভাবকদেরও চাপ ছিল। শিক্ষকরা চাপে পড়বেন যদি বিদ্যালয় পরীক্ষা শূন্য থাকে। এসব কারণে নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করলেও ওই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ করানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হাকিম নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ফলাফলের শিট দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া নির্বাচনী পরীক্ষায় কতজন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল, সেটিও তার জানা নেই।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বছর প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করায় আমরা বিস্মিত হয়েছি।’ বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের প্রায় সবাই চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এবার ১৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮ জন এসএসসির আগেই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। তাদের স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তারা স্ত্রীকে আর লেখাপড়া করাবেন না বলে জানিয়ে দেন। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার নদীভাঙনে সব হারিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। কেউ পাস না করায় তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। তারা জবাব দিয়েছে। সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তরিকুল ইসলাম বলেন, শতভাগ ফেল করা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। জবাব পেলে ফেলের কারণ জানতে অনুসন্ধান টিম গঠন করা হবে।

বাল্যবিয়ের বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। দুলাল চন্দ্র রায় নামের একজন বলেন, সুন্দর বর ও বরের পরিবার ভালো হওয়ায় মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। এখন মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ভালো আছে।

শুকু রায় চন্দ্র বলেন, তারা গরিব মানুষ। দিন মজুরির কাজ করে সংসার চলে। লেখাপড়ার খরচ চালানো খুবই কষ্ট। মেয়ে বড় হয়েছে, তাই বিয়ে দিয়েছেন।

বিষ্ণু চন্দ্র বর্মণ নামের আরেক অভিভাবক বলেন, ‘অটোরিকশা চালিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগান দিয়েছেন। কিন্তু মেয়েটা পাস করতে পারেনি। নির্বাচনী পরীক্ষায় গণিতে ফেল করেছিল। শিক্ষকদের অবহেলা আর উদাসীনতায় মেয়েরা ফেল করেছে।’

বিদ্যালয়ের এক পরীক্ষার্থীর দাবি, বিয়ের পর বেশিরভাগ সময়ই স্বামীর বাড়িতে থাকতে হয়। মাসে দু-এক দিন বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া এবার গণিতের প্রশ্নপত্র কঠিন ছিল। বিদ্যালয়ে ক্লাসও কম হয়েছে। এসব কারণে তারা ফেল করেছে।

একাধিক শিক্ষক জানান, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির মেয়েরাও বাল্যবিয়ের শিকার।

দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, ‘বাড়িতে সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ে আসা হয় না। বিদ্যালয়ে এলেও শিক্ষকরা থাকেন না। আমাদের অনেক বন্ধু বাল্যবিয়ের শিকার।’

গণিত শিক্ষক দীপক চন্দ্র বলেন, ‘ফেল করা শিক্ষার্থীরা বরাবরই বিদ্যালয়ে আসত না। একজন শিক্ষার্থী এক দিন এলে পরের দিন আসত না। পরীক্ষায় ফেল করলে শিক্ষকের কী করার আছে?’

তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী পরীক্ষার পর অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগেও শিক্ষার্থীদের সাড়া পাওয়া যায়নি। গণিত বিষয়ে কতজন পাস বা ফেল করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তার জানা নেই। তবে দীপক চন্দ্র স্বীকার করেন নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা না দিতে দিলে পরে তারা শিক্ষার্থী পাবেন না, এটা ভেবেই এসএসসিতে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের গণিতের সিনিয়র শিক্ষক অজিত কুমার বলেন, বর্তমান যে পদ্ধতি তাতে একটু ভালো লেখাপড়া করলে পাস করা যায়। নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করার পর এসএসসিতে অংশ নেওয়া ঠিক হয়নি। ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের শিক্ষককে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। এসএসসির ফরম পূরণ করার পর একজন শিক্ষার্থী তিন মাস সময় পান। একজন গণিত শিক্ষক উদ্যোগ নিলে চার-পাঁচজন শিক্ষার্থীকে পাস করানো সম্ভব। এ দায় প্রধান শিক্ষক এড়াতে পারেন না।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘগোয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে। ১০ বছর পর ২০০৪ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়। বিদ্যালয়ে ১৩ শিক্ষক ও ৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন। বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে শুধু মানবিক শাখা রয়েছে। বিদ্যালয়ের ৯০ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পায়। দশম শ্রেণিতে ৬ মাসে ১৯০০ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়া হয়। চলতি বছর যারা এসএসসি ফেল করেছে তাদের মধ্যে ৫ জন উপবৃত্তি পেত। বর্তমান প্রধান শিক্ষক যোগ দিয়েছেন গত বছর। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৬ এপ্রিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিদ্যালয় থেকে গত বছর ১৮ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ১৩ জন পাস করেছে। ২০২২ সালের ২১ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৭ জন।

জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক পদ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বাদশার মধ্যে মামলাও হয়েছিল। তবে প্রধান শিক্ষক বলেছেন, গত বছর অক্টোবর মাসে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবক দিনমজুর চরের লোক। তারা সন্তানকে বাড়িতে রেখে, বাইরে কাজে চলে যান। ফলে শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। আর এলাকার গরিব শ্রেণির শিক্ষার্থী আমার বিদ্যালয়ে বেশি। ভালো পরিবারের শিক্ষার্থীরা অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।’

কেন আপনার বিদ্যালয়ে ভালো ও সচ্ছল বা বিত্তবান পরিবারের মেয়েরা আসে না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাশেই ১৯৭৭ সাল থেকে একটি ভালো মানের বিদ্যালয় আছে। সেখানে ষষ্ঠ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এ ছাড়া মাত্র এক কিলোমিটার মধ্যে দুটি মাদ্রাসা রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসেন না। এলেও ক্লাস না নিয়েই বাইরে গিয়ে আড্ডা দেন। কিংবা অল্প সময় থেকে অন্য কাজে চলে যান। পাঠদানেও রয়েছে গড়িমসি, কর্তৃপক্ষের নজরদারি কম। প্রতিষ্ঠানটি এসব অনিয়মের মধ্যে চলছে। কয়েকজন শিক্ষক জুয়া খেলায় আসক্ত বলেও অভিযোগ করেন তারা।

তাদের দাবি, তৎকালীন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দিয়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় আশপাশের লোকজন তাদের সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে দিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছামাফিক চালান শিক্ষকরা। তাদের শৈথিল্যের জন্য কেউ পাস করেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত