দেশের বিরাজমান ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং সংকট মোকাবিলায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে বর্তমান গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশের বাড়ানোসহ সুদের হার আর না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম।
গতকাল বুধবার এফবিসিসিআইর গুলশান কার্যালয়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাত বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্বকালে এই মন্তব্য করেন তিনি। এতে অতিথি ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন।
আলোচনায় উভয় পক্ষ ব্যবসা ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে নিবিড়ভাবে ও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে একমত পোষণ করে। এজন্য নিয়মিত বিরতিতে সভা আয়োজনের বিষয়ে সম্মতিও প্রকাশ করেন তারা।
এফবিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় ও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা চলমান তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টেকসই উত্তরণ ও এসডিজি অর্জনে ব্যাংকিং খাতের সক্রিয় সহযোগিতা সর্বাত্মকভাবে প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহবুবুল আলম বলেন, ‘রাজনৈতিক ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বহু গুণ। স্থানীয় শিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে আমাদের শিল্প ও রপ্তানি খাতকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এফবিসিসিআই এবং ব্যাংকিং খাত যৌথভাবে কাজ করতে পারে বলে মন্তব্য করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
এ সময় এফবিসিসিআই সভাপতি দেশের বিরাজমান ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং সংকট মোকাবিলায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে বর্তমান গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশের ব্যবস্থাকরণ, উৎপাদনকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তরকরণ, ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিয়মিতভাবে যাতে এলসি খোলা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ, সুদের হার বৃদ্ধি না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়াদি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া, ডলার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকের চার্জ ও কমিশন যৌক্তিকীকরণ, দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে এক্সিট প্রদানের সুপারিশ করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত ও মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণে সব ব্যাংকের শাখায় এসএমইদের সহায়তায় হেল্পডেস্ক কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা, এসএমই ও মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য সহজশর্তে ও জামানতহীন ঋণের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
মাহবুবুল আলম বলেন, দ্রুত এবং কার্যকর ঋণ বিতরণের জন্য ডকুমেন্টেশন সহজ করা, যেসব এসএমইদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই সংশ্লিষ্ট ট্রেডবডির সুপারিশ অনুযায়ী তাদের ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো উপায়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতায় আনা, ব্যবসা খরচ কমিয়ে আনার স্বার্থে গত ৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত সুদহারের অতিরিক্ত কোনো সার্ভিস চার্জ আরোপ/আদায় না করার নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা ও সুপারভিশন চার্জ আদায় না হয় তা নিশ্চিত করা, এক্সপোর্ট বিল পরিশোধের সুপারিশের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে ব্যবসাবান্ধব সহযোগিতার আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম। এ সময় খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিশাল অন্তরায় উল্লেখ করে অনাদায়ি/খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।
সভায় অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ডলার বেচাকেনা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এক থেকে দুই মাসের মধ্যে অবস্থা আরও স্বস্তিদায়ক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সুদহার ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে ব্যাংকগুলো সর্বাত্মক চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও সিইও মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাত বিষয়ে এফবিসিসিআই ও ব্যাংকিং খাত-সংশ্লিষ্টরা মাঝেমধ্যে এমন বৈঠক করতে পারলে অনেক সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা যাবে। এর ফলে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দূরত্বও আরও কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আমিন হেলালী বৃহৎ শিল্পের মতো কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসাবান্ধব ব্যাংকিং নীতিমালা করতে ব্যাংকপ্রধানদের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বৃহৎ শিল্পগুলোও একসময় এসএমই ছিল। ব্যাংক তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল বলেই আজ তারা দাঁড়াতে পেরেছে। এখন আবার সময় এসেছে স্টার্ট-আপ, কুটির ও ক্ষুদ্র ব্যবসার উদ্যোগগুলোকে লালনপালন করে প্রতিষ্ঠিত করার। কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্পের প্রতি ব্যাংকগুলোকে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় অন্যদের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ার সাদাত সরকার, ড. যশোদা জীবন দেবনাথ, শমী কায়সার, মো. মুনির হোসেন, এফবিসিসিআই মহাসচিব মো. আলমগীর, বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
